শিরোনামঃ
হাতিরঝিল আদলে বগুড়া শহরের শাহ ফতেহ আলী সেতু
বগুড়া প্রতিনিধি:
- আপডেট ১০:৩৪:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
- / 24
৬৪ বছর আগে নির্মাণ করা বগুড়ার শাহ ফতেহ আলী সেতু পুননির্মাণের পর দীর্ঘ বঞ্চনার জনপদে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জেলার চার উপজেলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শহরে প্রবেশের দূরত্ব কমেছে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার। করতোয়া নদীর ওপর রাজধানীর হাতিরঝিল আদলে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সেতু। জনগুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কে জায়গা বৃদ্ধি হওয়ায় কমেছে যানবাহনের জটলা। নতুন সেতু আর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বৃহৎ সড়ক নেটওয়ার্ক বলে মনে করছেন পূর্ব বগুড়ার বাসিন্দারা।
গত শনিবার শহরের চেলোপাড়া এলাকার শাহ ফতেহ আলী সেতু আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি। লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে এক টুকরো হাতিরঝিল। জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, গাবতলী ও ধুনট উপজেলার জনগোষ্ঠী এই সেতুর ওপর বেশি নির্ভরশীল।
বগুড়া সড়ক বিভাগ জানায়, শহর থেকে গাবতলী ও সারিয়াকান্দি সড়কের শাহ ফতেহ আলী সেতু পুনর্নির্মাণে ব্যয় হয় ১৯ কোটি ৮৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। দুই পাশে সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণে আরও প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পুননির্মাণ করা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬৮ দশমিক ৭৫ মিটার এবং প্রস্থ (ক্যারেজ) ৭ দশমিক ৩০ মিটার। আরসিসি ও পিসি গার্ডার সেতুর ৬টি পিলারে ৩টি স্প্যান বসানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬২ সালে করতোয়া নদীর ওপর ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতুর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন সংস্কার অভাবে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ সালে সেতু ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে পাটাতন ও গার্ডারের কিছু অংশ সংস্কার করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করে দুই পাশে সিমেন্টের খুঁটি পুঁতে দেয়। ২০২১ সালে সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। ২০২২ সালে নকশাসহ অর্থ বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। শুরু হওয়া পুননির্মাণ কাজে চুক্তি হয় ১৯ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৬ টাকা। প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ২২ কোটি ৬৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৫০ টাকা। ২০২৩ সালে চুক্তি সম্পাদনের পর উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে সময়সীমা শেষ হলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় নির্মাণকাজ থমকে গিয়েছিল। কয়েক দফা কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় গতবছরও সময় বাড়ানো হয়। দীর্ঘ কয়েকবছর ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার পর পুনরায় সরাসরি যোগাযোগ সচল করেছে সড়ক বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্ব বগুড়ার লাখো মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর হবে নতুন সেতু। সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, গাবতলী ও ধুনট উপজেলার কৃষকরা ভোগান্তি ছাড়াই শহরের বাজারগুলোতে কৃষিপণ্য সরবরাহ করছেন। শহরমুখী সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। যমুনা নদীর জেলেরা খুব সহজে ভারী যানবাহনে মাছ সরবরাহ করছেন। শহরের ফতেহ আলী মাজার গেট থেকে চেলোপাড়া সিএনজি স্ট্যান্ড পর্যন্ত দিনব্যাপী যানজট লেগেই থাকত। শাহ ফতেহ আলী সেতু পুনর্নির্মাণ হওয়ায় সব রকমের যানবাহনের জটলা কমেছে। যানবাহন চলাচলের জায়গা বৃদ্ধি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চার উপজেলার লোকজন ছাড়াও বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের চেলোপাড়া, নারুলী, কইপাড়া, নাটাইপাড়া, সাবগ্রাম, আকাশতারাসহ বিভিন্ন এলাকার লাখ লাখ মানুষ করতোয়া নদী পারাপার হয়ে জেলা শহরে যাতায়াত করেন। তাদের একমাত্র ভরসা শাহ ফতেহ আলী সেতু। বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা খেতের সবজি নিয়ে প্রতিদিন সকালে রাজাবাজারে আড়তে বিক্রি করেন। নদীর পূর্ব এলাকার লোকজন বাজার, কেনাকাটা ও দাপ্তরিক কাজে নদীর পশ্চিমে যাতায়াত করে। পূর্বপাড় চাষিবাজার আড়তে প্রতিদিন ভোরে মাছের পাইকারি বাজার বসে। পশ্চিমপাড় ফতেহ আলী বাজার, বকশীবাজার, খান্দার বাজার, কলোনি বাজার, নামাজগড় বাজার, কালীতলা বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা চাষিবাজার থেকে পাইকারি মাছ কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগুরুত্বপূর্ণ সেতু দৃষ্টিনন্দন রূপ পেয়েছে। একসময়ের শাহ ফতেহ আলী ব্রিজ এখন দেশের দ্বিতীয় হাতিরঝিল নামেও বেশ পরিচিতি পাচ্ছে।
পুননির্মাণ করা সেতু উদ্বোধনকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি, জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা এমপি, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. মোশারফ হোসেন এমপি, বগুড়া সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান, জেলা পরিষদ প্রশাসক আহসানুল তৈয়ব জাকির, বগুড়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক, পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ পিপিএম উপস্থিত ছিলেন।
ট্যাগ















