০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমাজের আয়নায় ‘লিলিথ’

আসিফ হাসান রাজু
  • Update Time : ০৫:১৭:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৮৮ Time View

বাংলা নাটকের ইতিহাসে ‘লিলিথ’ নামটি ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরে প্রচারিত শাখাওয়াত হোসেন রচিত এবং আশিকুর রহমান পরিচালিত এই নাটকটি দর্শক ও সমালোচক—উভয় মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই যেন বেশি উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সমালোচনাগুলিই নাটকটির গভীর তাৎপর্যকে উন্মোচিত করে। কারণ ‘লিলিথ’ শুধুমাত্র একটি নাট্যকর্ম না, বরং নাটকটি আমাদের সমাজের একটি সাংস্কৃতিক দর্পণ, যেখানে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মূল্যবোধ, দ্বন্দ্ব এবং পরিবর্তনের গতিশীল চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র লিলি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সিঙ্গেল মাদার এবং একজন ডিভোর্সি নারী। ভালোবেসে নিজের পছন্দে বিয়ে করলেও পারিবারিক অশান্তির কারণে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। নাটকটি দেখায় কীভাবে তিনি সমাজের আরোপিত ‘ডিভোর্সি’ পরিচয় নিয়ে জীবনযাপন করেন এবং আত্মমর্যাদা বজায় রেখে নিজের অবস্থান নির্মাণের সংগ্রাম চালিয়ে যান। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ব্যক্তিগত জীবনের গল্প হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এটি আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে স্পর্শ করে। নাটকটি নিয়ে সমালোচকদের একটি বড় অংশ একে ‘নারীবাদের প্রচারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নাটকের নামকরণ, চরিত্রের আচরণ এবং উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু এই সমালোচনার অন্তরালে কাজ করছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অস্বস্তি। প্রশ্ন হলো—আমরা যখন লিলিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলি, তখন আসলে কী বোঝাতে চাই? লিলি কি সত্যিই অস্বাভাবিক, নাকি তিনি আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত ‘স্বাভাবিক নারী’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন বলেই তাঁকে অস্বাভাবিক মনে হয়? বিবাহিত, গৃহকেন্দ্রিক এবং স্বামীর অধীনস্থ নারী—এই যে সামাজিকভাবে নির্মিত ‘স্বাভাবিক’ নারীর প্রতিচ্ছবি, লিলি তার বাইরে অবস্থান করেন। তিনি ডিভোর্সি, তিনি একা সন্তান লালন-পালন করেন, এবং তিনি পুরুষতান্ত্রিক নির্ভরতার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রতিটি অবস্থানই প্রচলিত সাংস্কৃতিক ব্যাকরণকে ভেঙে দেয় এবং সেখান থেকেই সামাজিক অস্বস্তির জন্ম হয়। নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাঙালি সমাজে ডিভোর্সি নারীর অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহবিচ্ছেদের পর নারী এক ধরনের লিমিনাল (liminal) বা সীমান্তবর্তী অবস্থায় অবস্থান করেন—তিনি আর কারও স্ত্রী নন, আবার সম্পূর্ণ সামাজিক বহিষ্কৃতও নন। এই মধ্যবর্তী অবস্থান তাঁকে সমাজের চোখে ‘অনিশ্চিত’ ও কখনও ‘বিপজ্জনক’ করে তোলে। ফলে তাঁকে ঘিরে গসিপ, লেবেলিং, সামাজিক স্টিগমা এবং আংশিক বর্জনের প্রবণতা তৈরি হয়। এগুলো আসলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল, যার মাধ্যমে প্রচলিত কাঠামোকে রক্ষা করা হয়। ‘ডিভোর্সি’ শব্দটি নিজেই একটি শক্তিশালী সামাজিক লেবেল, যা ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয়কে সংকুচিত করে ফেলে। লিলি তখন আর শুধু একজন মানুষ নন; তিনি হয়ে যান ‘ডিভোর্সি লিলি’। তাঁর পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য এই একক পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। নাটকটি এই লেবেলিং প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই অবস্থান গ্রহণ করে এবং দেখায়—মানুষ তার বৈবাহিক অবস্থানের চেয়েও অনেক বৃহত্তর একটি সত্তা। নাটকের নাম ‘লিলিথ’-এর মধ্যেও গভীর প্রতীকী তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। ইহুদি পুরাণ অনুসারে, লিলিথ ছিলেন আদমের প্রথম স্ত্রী, যিনি সমতার দাবি করেছিলেন এবং তা অস্বীকার করা হলে স্বর্গ ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে ‘রাক্ষসী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। অর্থাৎ, যে নারী পুরুষের অধীনতা স্বীকার করেননি, সমাজ তাকে ভয়ংকর রূপে উপস্থাপন করেছে। নাটকের লিলি এই পৌরাণিক লিলিথের আধুনিক প্রতিরূপ। তিনিও প্রতিষ্ঠিত সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন করেন, নিজের পথ নিজেই নির্মাণ করেন এবং সমাজের চোখে ‘কঠিন’ বা ‘রুক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত হন। এই নামকরণ ব্যক্তিগত গল্পকে সার্বজনীন অর্থ প্রদান করে এবং দেখায়—লিলির সংগ্রাম আসলে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ‘লিলিথ’ নাটককে ঘিরে যে দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা আমাদের সমাজের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। একদল দর্শক নাটকটিকে সাহসী ও সময়োপযোগী হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। অভিনেত্রী তানজিকা আমিনের সংযত অভিনয়, বিশেষ করে তাঁর নীরব অভিব্যক্তি ও চোখের ভাষা, দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। সংলাপের গভীরতা ও নির্মাণশৈলীও প্রশংসিত হয়েছে।

অন্যদিকে, সমালোচকদের একটি অংশ নাটকটিকে অতিরঞ্জিত ও ‘অপ্রাকৃতিক’ বলে অভিহিত করেছেন। এই বিরোধ মূলত শিল্প সম্পর্কে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষকে নির্দেশ করে। একদিকে শিল্পকে শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, যেখানে গল্প হবে সরল ও সমাপ্তি হবে স্বস্তিদায়ক। অন্যদিকে শিল্পকে দেখা হয় চিন্তার উদ্রেককারী একটি মাধ্যম হিসেবে, যেখানে দর্শককে সক্রিয়ভাবে ভাবতে ও অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়।

‘লিলিথ’ দ্বিতীয় ধারার শিল্পকর্ম। এটি দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্ন করতে বাধ্য করে এবং আত্মসমালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে। নৃবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নাটকটিকে একটি ‘সাংস্কৃতিক টেক্সট’ হিসেবে দেখা যায়, যেখানে সমাজের গভীর কাঠামো, মূল্যবোধ ও সংঘর্ষ প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রথমত, নাটকটি দেখায় কীভাবে সামাজিক কাঠামো ব্যক্তি জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে—বিবাহের পবিত্রতা, নারীর গৃহস্থালিক ভূমিকা এবং ‘ভালো মেয়ে’র আদর্শের মাধ্যমে। একই সঙ্গে এটি ব্যক্তির প্রতিরোধের রূপও তুলে ধরে—অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নীরব প্রতিবাদ এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনের মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত, নাটকটি বিবাহ প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। প্রেমের বিয়ে ভেঙে গেলে কেন নারীকে দায়ী করা হয়? বিবাহবিচ্ছেদের পর সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠিত হয়—এই প্রশ্নগুলো নাটকটির কেন্দ্রে অবস্থান করে।

তৃতীয়ত, নাটকটি দেখায় কীভাবে সমাজ ‘অস্বাভাবিকতা’র ধারণা তৈরি করে প্রান্তিক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ করে। গসিপ, লেবেলিং ও সামাজিক বর্জন এখানে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে; তবে একই সঙ্গে প্রান্তিক মানুষদের প্রতিরোধের সম্ভাবনাও প্রকাশ পায়।

চতুর্থত, নাটকটি পৌরাণিক প্রত্নপ্রতিমা ও আধুনিক বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। লিলি কেবল একজন ডিভোর্সি নারী নন; তিনি একটি প্রতীক—একটি চলমান সামাজিক রূপান্তরের প্রতিনিধিত্ব।
সর্বোপরি, ‘লিলিথ’ আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল। এটি দেখায় যে সমাজ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে—বিবাহ, পরিবার ও লিঙ্গভূমিকার ধারণা পুনর্গঠিত হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না; ফলে সংঘর্ষ ও বিতর্ক অনিবার্য হয়ে উঠছে।
লিলি চরিত্রটি নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। তিনি দেখান যে নারী নিজের পথ নিজেই নির্মাণ করতে পারে এবং সামাজিক বিচারকে নিজের পরিচয়ের মানদণ্ড হতে দেয় না। এই সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়ে সমাজের একাংশ প্রতিরোধ গড়ে তোলে—আর নাটকটিকে ঘিরে সমালোচনা সেই প্রতিরোধেরই প্রকাশ।
তবুও পরিবর্তন অনিবার্য। শিল্পকলার কাজ হলো সেই পরিবর্তনকে ধারণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা। ‘লিলিথ’ সেই কাজটিই করেছে। প্রশংসা ও সমালোচনা—উভয়ই আমাদের সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রতিফলন। প্রশংসা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নির্দেশ করে, আর সমালোচনা পুরনো মূল্যবোধের স্থায়িত্বকে তুলে ধরে।
এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে। ‘লিলিথ’ সেই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। হয়তো সবাই এটিকে গ্রহণ করেনি, কিন্তু এটি প্রমাণ করেছে—বাংলা নাটক এখনও সাহসী হতে পারে, নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে এবং দর্শককে চিন্তা করতে বাধ্য করতে পারে।
লিলি দাঁড়িয়ে আছেন এক সীমান্তবর্তী অবস্থানে—পুরনো ও নতুনের সংযোগস্থলে। তাঁর সংগ্রাম আমাদের সময়ের সংগ্রাম, তাঁর প্রশ্ন আমাদের সকলের প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।

লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

সমাজের আয়নায় ‘লিলিথ’

Update Time : ০৫:১৭:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলা নাটকের ইতিহাসে ‘লিলিথ’ নামটি ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরে প্রচারিত শাখাওয়াত হোসেন রচিত এবং আশিকুর রহমান পরিচালিত এই নাটকটি দর্শক ও সমালোচক—উভয় মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই যেন বেশি উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সমালোচনাগুলিই নাটকটির গভীর তাৎপর্যকে উন্মোচিত করে। কারণ ‘লিলিথ’ শুধুমাত্র একটি নাট্যকর্ম না, বরং নাটকটি আমাদের সমাজের একটি সাংস্কৃতিক দর্পণ, যেখানে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মূল্যবোধ, দ্বন্দ্ব এবং পরিবর্তনের গতিশীল চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র লিলি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সিঙ্গেল মাদার এবং একজন ডিভোর্সি নারী। ভালোবেসে নিজের পছন্দে বিয়ে করলেও পারিবারিক অশান্তির কারণে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। নাটকটি দেখায় কীভাবে তিনি সমাজের আরোপিত ‘ডিভোর্সি’ পরিচয় নিয়ে জীবনযাপন করেন এবং আত্মমর্যাদা বজায় রেখে নিজের অবস্থান নির্মাণের সংগ্রাম চালিয়ে যান। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ব্যক্তিগত জীবনের গল্প হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এটি আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে স্পর্শ করে। নাটকটি নিয়ে সমালোচকদের একটি বড় অংশ একে ‘নারীবাদের প্রচারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নাটকের নামকরণ, চরিত্রের আচরণ এবং উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু এই সমালোচনার অন্তরালে কাজ করছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অস্বস্তি। প্রশ্ন হলো—আমরা যখন লিলিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলি, তখন আসলে কী বোঝাতে চাই? লিলি কি সত্যিই অস্বাভাবিক, নাকি তিনি আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত ‘স্বাভাবিক নারী’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন বলেই তাঁকে অস্বাভাবিক মনে হয়? বিবাহিত, গৃহকেন্দ্রিক এবং স্বামীর অধীনস্থ নারী—এই যে সামাজিকভাবে নির্মিত ‘স্বাভাবিক’ নারীর প্রতিচ্ছবি, লিলি তার বাইরে অবস্থান করেন। তিনি ডিভোর্সি, তিনি একা সন্তান লালন-পালন করেন, এবং তিনি পুরুষতান্ত্রিক নির্ভরতার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রতিটি অবস্থানই প্রচলিত সাংস্কৃতিক ব্যাকরণকে ভেঙে দেয় এবং সেখান থেকেই সামাজিক অস্বস্তির জন্ম হয়। নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাঙালি সমাজে ডিভোর্সি নারীর অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহবিচ্ছেদের পর নারী এক ধরনের লিমিনাল (liminal) বা সীমান্তবর্তী অবস্থায় অবস্থান করেন—তিনি আর কারও স্ত্রী নন, আবার সম্পূর্ণ সামাজিক বহিষ্কৃতও নন। এই মধ্যবর্তী অবস্থান তাঁকে সমাজের চোখে ‘অনিশ্চিত’ ও কখনও ‘বিপজ্জনক’ করে তোলে। ফলে তাঁকে ঘিরে গসিপ, লেবেলিং, সামাজিক স্টিগমা এবং আংশিক বর্জনের প্রবণতা তৈরি হয়। এগুলো আসলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল, যার মাধ্যমে প্রচলিত কাঠামোকে রক্ষা করা হয়। ‘ডিভোর্সি’ শব্দটি নিজেই একটি শক্তিশালী সামাজিক লেবেল, যা ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয়কে সংকুচিত করে ফেলে। লিলি তখন আর শুধু একজন মানুষ নন; তিনি হয়ে যান ‘ডিভোর্সি লিলি’। তাঁর পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য এই একক পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। নাটকটি এই লেবেলিং প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই অবস্থান গ্রহণ করে এবং দেখায়—মানুষ তার বৈবাহিক অবস্থানের চেয়েও অনেক বৃহত্তর একটি সত্তা। নাটকের নাম ‘লিলিথ’-এর মধ্যেও গভীর প্রতীকী তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। ইহুদি পুরাণ অনুসারে, লিলিথ ছিলেন আদমের প্রথম স্ত্রী, যিনি সমতার দাবি করেছিলেন এবং তা অস্বীকার করা হলে স্বর্গ ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে ‘রাক্ষসী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। অর্থাৎ, যে নারী পুরুষের অধীনতা স্বীকার করেননি, সমাজ তাকে ভয়ংকর রূপে উপস্থাপন করেছে। নাটকের লিলি এই পৌরাণিক লিলিথের আধুনিক প্রতিরূপ। তিনিও প্রতিষ্ঠিত সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন করেন, নিজের পথ নিজেই নির্মাণ করেন এবং সমাজের চোখে ‘কঠিন’ বা ‘রুক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত হন। এই নামকরণ ব্যক্তিগত গল্পকে সার্বজনীন অর্থ প্রদান করে এবং দেখায়—লিলির সংগ্রাম আসলে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ‘লিলিথ’ নাটককে ঘিরে যে দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা আমাদের সমাজের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। একদল দর্শক নাটকটিকে সাহসী ও সময়োপযোগী হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। অভিনেত্রী তানজিকা আমিনের সংযত অভিনয়, বিশেষ করে তাঁর নীরব অভিব্যক্তি ও চোখের ভাষা, দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। সংলাপের গভীরতা ও নির্মাণশৈলীও প্রশংসিত হয়েছে।

অন্যদিকে, সমালোচকদের একটি অংশ নাটকটিকে অতিরঞ্জিত ও ‘অপ্রাকৃতিক’ বলে অভিহিত করেছেন। এই বিরোধ মূলত শিল্প সম্পর্কে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষকে নির্দেশ করে। একদিকে শিল্পকে শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, যেখানে গল্প হবে সরল ও সমাপ্তি হবে স্বস্তিদায়ক। অন্যদিকে শিল্পকে দেখা হয় চিন্তার উদ্রেককারী একটি মাধ্যম হিসেবে, যেখানে দর্শককে সক্রিয়ভাবে ভাবতে ও অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়।

‘লিলিথ’ দ্বিতীয় ধারার শিল্পকর্ম। এটি দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্ন করতে বাধ্য করে এবং আত্মসমালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে। নৃবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নাটকটিকে একটি ‘সাংস্কৃতিক টেক্সট’ হিসেবে দেখা যায়, যেখানে সমাজের গভীর কাঠামো, মূল্যবোধ ও সংঘর্ষ প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রথমত, নাটকটি দেখায় কীভাবে সামাজিক কাঠামো ব্যক্তি জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে—বিবাহের পবিত্রতা, নারীর গৃহস্থালিক ভূমিকা এবং ‘ভালো মেয়ে’র আদর্শের মাধ্যমে। একই সঙ্গে এটি ব্যক্তির প্রতিরোধের রূপও তুলে ধরে—অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নীরব প্রতিবাদ এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনের মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত, নাটকটি বিবাহ প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। প্রেমের বিয়ে ভেঙে গেলে কেন নারীকে দায়ী করা হয়? বিবাহবিচ্ছেদের পর সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠিত হয়—এই প্রশ্নগুলো নাটকটির কেন্দ্রে অবস্থান করে।

তৃতীয়ত, নাটকটি দেখায় কীভাবে সমাজ ‘অস্বাভাবিকতা’র ধারণা তৈরি করে প্রান্তিক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ করে। গসিপ, লেবেলিং ও সামাজিক বর্জন এখানে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে; তবে একই সঙ্গে প্রান্তিক মানুষদের প্রতিরোধের সম্ভাবনাও প্রকাশ পায়।

চতুর্থত, নাটকটি পৌরাণিক প্রত্নপ্রতিমা ও আধুনিক বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। লিলি কেবল একজন ডিভোর্সি নারী নন; তিনি একটি প্রতীক—একটি চলমান সামাজিক রূপান্তরের প্রতিনিধিত্ব।
সর্বোপরি, ‘লিলিথ’ আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল। এটি দেখায় যে সমাজ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে—বিবাহ, পরিবার ও লিঙ্গভূমিকার ধারণা পুনর্গঠিত হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না; ফলে সংঘর্ষ ও বিতর্ক অনিবার্য হয়ে উঠছে।
লিলি চরিত্রটি নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। তিনি দেখান যে নারী নিজের পথ নিজেই নির্মাণ করতে পারে এবং সামাজিক বিচারকে নিজের পরিচয়ের মানদণ্ড হতে দেয় না। এই সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়ে সমাজের একাংশ প্রতিরোধ গড়ে তোলে—আর নাটকটিকে ঘিরে সমালোচনা সেই প্রতিরোধেরই প্রকাশ।
তবুও পরিবর্তন অনিবার্য। শিল্পকলার কাজ হলো সেই পরিবর্তনকে ধারণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা। ‘লিলিথ’ সেই কাজটিই করেছে। প্রশংসা ও সমালোচনা—উভয়ই আমাদের সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রতিফলন। প্রশংসা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নির্দেশ করে, আর সমালোচনা পুরনো মূল্যবোধের স্থায়িত্বকে তুলে ধরে।
এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে। ‘লিলিথ’ সেই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। হয়তো সবাই এটিকে গ্রহণ করেনি, কিন্তু এটি প্রমাণ করেছে—বাংলা নাটক এখনও সাহসী হতে পারে, নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে এবং দর্শককে চিন্তা করতে বাধ্য করতে পারে।
লিলি দাঁড়িয়ে আছেন এক সীমান্তবর্তী অবস্থানে—পুরনো ও নতুনের সংযোগস্থলে। তাঁর সংগ্রাম আমাদের সময়ের সংগ্রাম, তাঁর প্রশ্ন আমাদের সকলের প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।

লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।