০৮:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বগুড়ায় খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

স্টাফ রিপোর্টার
  • Update Time : ০৮:৩০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ২৬২ Time View
​প্রকৃতির পালাবদলে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে শিশির ভেজা সকাল আর খেজুরের মিষ্টি রসের সুবাস। আর এই সুবাসেই এখন ম-ম করছে বগুড়ার গ্রামীণ জনপদ।
শীতের হিমেল ছোঁয়া জানান দিচ্ছে খেজুর রস সংগ্রহের ঐতিহ্যবাহী মৌসুম শুরু হয়ে গেছে।বগুড়া জেলার শাজাহানপুর,শেরপুর, কাহালু,নন্দীগ্রাম,আদমদীঘিসহ জেলার ১২টি উপজেলাতেই গাছিরা এখন দিনরাত পরিশ্রম করে কাটাচ্ছেন,কারণ শীতকালীন এই উৎসবকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা তুঙ্গে।
​পুরো জেলাজুড়েই গাছিরা কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছের মগডালে উঠছেন। বছরের অন্য সময় অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকলেও, শীত এলেই তারা ফিরে আসেন এই আদি পেশায়। ধারালো দা দিয়ে গাছের সোনালী অংশ বের করছে বা স্থানীয় ভাষায় চাঁচ দেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখানে নল বসিয়ে মাটির কলস ও হাঁড়ি প্রস্তুত করছেন রস সংগ্রহের জন্য।
​জানা যায়,কার্তিক মাসে শেষে অগ্রহায়নের শুরুতে গাছ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। খেজুরের রস আহরন করা হয় অগ্রহায়ন মাস থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত একটি গাছ কি পরিমাণ রস দেবে, তা নির্ভর করে মাটি ও গাছের স্বাস্থ্যের ওপর। বর্তমানে বগুড়ায় একেকটি গাছ থেকে গড়ে ৪ থেকে ৫ লিটার পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
​বগুড়ার খেজুর রস কেবল গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য নয়,এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই রস দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালী গুড়, লালী ও দানা গুড়, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ হয়। দেশজুড়ে বগুড়ার গুড়ের চাহিদা থাকায় গাছিরা তাদের বাড়ি থেকেই পাইকারী বিক্রি করে সময় ও অর্থ দুটোই লাভবান হচ্ছেন। স্থানীয় বাজারগুলোতে মাটির কলস ও হাঁড়ির চাহিদাও বেড়ে যাওয়ায় শীতের মৌসুম ঘিরে জমজমাট ব্যবসা শুরু হয়েছে।
শীতকালীন সকালের নাস্তায় মুড়ির সাথে খেজুরের রস, আর ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল দিয়ে গ্রামীণ বধূরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নানা ধরনের পিঠা তৈরিতে। খেজুরের রসের পায়েস, পিঠে,পুলি, ক্ষীর,সন্দেশ,ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ পিঠাসহ হরেক রকমের বাহারি পিঠা তৈরির কদর আজও গ্রামবাংলায় অমলিন।
​তবে গাছিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। একসময় রাস্তার ধারে,পুকুরপাড়ে অসংখ্য গাছ দেখা গেলেও এখন সেসব হাতে গোনা। ফলে দুপচাঁচিয়া,নন্দীগ্রাম,শাজাহানপুর,শেরপুর,আদমদীঘিসহ অনেক এলাকায়ই গাছিদের সংখ্যা ও কার্যক্রম দুই-ই কমে এসেছে। গাছিদের মতে,আগে প্রতিটি গাছ থেকে দিনে ৭ থেকে ৮ লিটার রস পাওয়া যেত,এখন তা নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ লিটারে।
নন্দীগ্রাম উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের আকবর হোসেন, বিজরুল গ্রামের হোসেন আলী ও আব্দুল আলীম জানান,চলতি মৌসুমে তিনশত খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস আহরণ করবেন। খেজুরগাছের রস, গুড়-পাটালি বিক্রয় করে খরচ বাদে প্রায় ২ লাখ টাকা লাভের আশা করছে তারা।
​দুপচাঁচিয়া উপজেলার খানাবাড়ি গ্রামের গাছি আরিফুল ইসলাম জানান,দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় আছে। এ বছর ৮০ টির মতো গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে এবার কিছুটা দেরিতে শুরু করছে রস সংগ্রহের কাজ।
আদমদীঘি উপজেলার তালসন গ্রামের খেজুর গাছি এনামুল ইসলাম জানায়, গত কয়েক বছর আগে যে পরিমান খেজুর গাছ ছিল বর্তমানে তার অর্ধেকও নেই। এবার ১০০ খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছে,তিনি প্রতিবছরই রস সংগ্রহ করে থাকে।
এই বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান,প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় খেজুর গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা রাস্তার দুই পাশে এবং পরিত্যক্ত জমিতে খেজুর গাছ লাগাতে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। সঠিক পরিচর্যা করা হলে শীত মৌসুমে স্থানীয়ভাবে রস ও গুড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্যিকভাবেও আয় করা সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন,​খেজুর রস আর গুড়ের এই মিষ্টি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে গাছিরা এখন আরও বেশি মনোযোগী। ভোরের আলো ফুটতেই তাদের হাঁড়ি ভরা রসের সুবাস বগুড়ার গ্রামবাংলাকে এক অনন্য উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তুলেছে।
Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

বগুড়ায় খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

Update Time : ০৮:৩০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
​প্রকৃতির পালাবদলে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে শিশির ভেজা সকাল আর খেজুরের মিষ্টি রসের সুবাস। আর এই সুবাসেই এখন ম-ম করছে বগুড়ার গ্রামীণ জনপদ।
শীতের হিমেল ছোঁয়া জানান দিচ্ছে খেজুর রস সংগ্রহের ঐতিহ্যবাহী মৌসুম শুরু হয়ে গেছে।বগুড়া জেলার শাজাহানপুর,শেরপুর, কাহালু,নন্দীগ্রাম,আদমদীঘিসহ জেলার ১২টি উপজেলাতেই গাছিরা এখন দিনরাত পরিশ্রম করে কাটাচ্ছেন,কারণ শীতকালীন এই উৎসবকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা তুঙ্গে।
​পুরো জেলাজুড়েই গাছিরা কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছের মগডালে উঠছেন। বছরের অন্য সময় অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকলেও, শীত এলেই তারা ফিরে আসেন এই আদি পেশায়। ধারালো দা দিয়ে গাছের সোনালী অংশ বের করছে বা স্থানীয় ভাষায় চাঁচ দেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখানে নল বসিয়ে মাটির কলস ও হাঁড়ি প্রস্তুত করছেন রস সংগ্রহের জন্য।
​জানা যায়,কার্তিক মাসে শেষে অগ্রহায়নের শুরুতে গাছ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। খেজুরের রস আহরন করা হয় অগ্রহায়ন মাস থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত একটি গাছ কি পরিমাণ রস দেবে, তা নির্ভর করে মাটি ও গাছের স্বাস্থ্যের ওপর। বর্তমানে বগুড়ায় একেকটি গাছ থেকে গড়ে ৪ থেকে ৫ লিটার পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
​বগুড়ার খেজুর রস কেবল গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য নয়,এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই রস দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালী গুড়, লালী ও দানা গুড়, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ হয়। দেশজুড়ে বগুড়ার গুড়ের চাহিদা থাকায় গাছিরা তাদের বাড়ি থেকেই পাইকারী বিক্রি করে সময় ও অর্থ দুটোই লাভবান হচ্ছেন। স্থানীয় বাজারগুলোতে মাটির কলস ও হাঁড়ির চাহিদাও বেড়ে যাওয়ায় শীতের মৌসুম ঘিরে জমজমাট ব্যবসা শুরু হয়েছে।
শীতকালীন সকালের নাস্তায় মুড়ির সাথে খেজুরের রস, আর ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল দিয়ে গ্রামীণ বধূরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নানা ধরনের পিঠা তৈরিতে। খেজুরের রসের পায়েস, পিঠে,পুলি, ক্ষীর,সন্দেশ,ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ পিঠাসহ হরেক রকমের বাহারি পিঠা তৈরির কদর আজও গ্রামবাংলায় অমলিন।
​তবে গাছিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। একসময় রাস্তার ধারে,পুকুরপাড়ে অসংখ্য গাছ দেখা গেলেও এখন সেসব হাতে গোনা। ফলে দুপচাঁচিয়া,নন্দীগ্রাম,শাজাহানপুর,শেরপুর,আদমদীঘিসহ অনেক এলাকায়ই গাছিদের সংখ্যা ও কার্যক্রম দুই-ই কমে এসেছে। গাছিদের মতে,আগে প্রতিটি গাছ থেকে দিনে ৭ থেকে ৮ লিটার রস পাওয়া যেত,এখন তা নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ লিটারে।
নন্দীগ্রাম উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের আকবর হোসেন, বিজরুল গ্রামের হোসেন আলী ও আব্দুল আলীম জানান,চলতি মৌসুমে তিনশত খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস আহরণ করবেন। খেজুরগাছের রস, গুড়-পাটালি বিক্রয় করে খরচ বাদে প্রায় ২ লাখ টাকা লাভের আশা করছে তারা।
​দুপচাঁচিয়া উপজেলার খানাবাড়ি গ্রামের গাছি আরিফুল ইসলাম জানান,দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় আছে। এ বছর ৮০ টির মতো গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে এবার কিছুটা দেরিতে শুরু করছে রস সংগ্রহের কাজ।
আদমদীঘি উপজেলার তালসন গ্রামের খেজুর গাছি এনামুল ইসলাম জানায়, গত কয়েক বছর আগে যে পরিমান খেজুর গাছ ছিল বর্তমানে তার অর্ধেকও নেই। এবার ১০০ খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছে,তিনি প্রতিবছরই রস সংগ্রহ করে থাকে।
এই বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান,প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় খেজুর গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা রাস্তার দুই পাশে এবং পরিত্যক্ত জমিতে খেজুর গাছ লাগাতে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। সঠিক পরিচর্যা করা হলে শীত মৌসুমে স্থানীয়ভাবে রস ও গুড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্যিকভাবেও আয় করা সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন,​খেজুর রস আর গুড়ের এই মিষ্টি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে গাছিরা এখন আরও বেশি মনোযোগী। ভোরের আলো ফুটতেই তাদের হাঁড়ি ভরা রসের সুবাস বগুড়ার গ্রামবাংলাকে এক অনন্য উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তুলেছে।