রাতের অন্ধকারে অসহায় কিশোরীর পাশে জনতা; শেরপুর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
- Update Time : ০৩:২৩:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- / ৩৪ Time View

ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে বগুড়ার শেরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা। ঘড়ির কাঁটায় তখন ২০ মে দিবাগত রাত প্রায় এগারোটা। চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছিল। ঠিক এমন সময় মহাসড়কের পাশের একটি দোকানের অন্ধকার বারান্দায় একা গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে দেখা যায় ১০-১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে। গভীর রাতে একাকী এই শিশুকে দেখে অধিকাংশ পথচারী এড়িয়ে গেলেও, স্থানীয় কয়েকজন যুবকের চোখে পড়ে বিষয়টি। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তারা এগিয়ে যান শিশুটির কাছে।
শুরু হয় তার পরিচয় জানার চেষ্টা। অভয় পেয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে কিশোরী জানায়, তার নাম জান্নাতি খাতুন। তার জীবনের গল্পটি আর দশটা শিশুর মতো সাধারণ নয়, চরম নির্মমতার। জান্নাতি জানায়, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তার চেনা পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়। বাবা ঢাকায় গিয়ে নতুন সংসার পেতেছেন, মা-ও অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন। ফলে কোথাও ঠাঁই হয়নি ফুটফুটে এই শিশুটির। কখনো খালার বাড়ি, কখনো মামার বাড়িতে আশ্রয় মিললেও কপালে জুটেছে শুধু নির্যাতন আর অবহেলা। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে অজানার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে সে।
অসহায় কিশোরীর এমন পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় জাফর, মুজাহিদ, তনু, সাব্বির ও সবুজ সহ কয়েকজন যুবক তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে শরণাপন্ন হন শেরপুর থানা পুলিশের। কিন্তু সেখানে গিয়ে সহযোগিতার বদলে অসহযোগিতামূলক আচরণের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
যুবকদের দাবি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন মেয়েটিকে থানায় রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তাদের আত্মীয়স্বজনের খোঁজ তাদের নিজ দায়িত্বে নিতে বলেন এবং মেয়েটিকে থানায় রাখা সম্ভব নয় বলে জানান। না পারলে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যেতে বলা হয় তাদের।
এতে বিপাকে পড়ে যান মানবিক দায়িত্ব পালন করতে আসা ওই যুবকেরা। গভীর রাত পর্যন্ত তারা কিশোরীটিকে নিয়ে থানার চত্বরে অপেক্ষা করেন। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমুকে (ইউএনও) মুঠোফোনে জানানো হয়। তারপরও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি থানা পুলিশ এমন অভিযোগও তাদের।
অবশেষে বাধ্য হয়ে স্থানীয় ওই যুবকেরা কিশোরীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার স্বজনদের খোঁজ শুরু করেন। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর গভীর রাতে শাহবন্দেগী ইউনিয়নের দহপাড়া গ্রামে তার মামার বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে মামা ও নানার সঙ্গে কথা বলে কিশোরীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর শেরপুর উপজেলা শাখার সভাপতি নিমাই ঘোষ বলেন, বিপদে পড়লে মানুষ প্রথমেই থানার দ্বারস্থ হয়, এটা তো তাদের দায়িত্ব নিয়ে সহযোগিতা করার কথা। সেখানে সহযোগিতার বদলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে মানবিক কাজে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
এ বিষয়ে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, মানবিকতা দেখাতে গিয়ে আমি তো আইনের বাইরে কাজ করতে পারি না। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা আছে, কোনো প্রতিবন্ধী বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে থানায় রাখা যাবে না। তাই আমরা তাদের আত্মীয়স্বজনের খোঁজ করার পরামর্শ দিয়েছি, অথবা নিজেদের হেফাজতে রাখতে বলেছি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমিও মানবিক দিক বিবেচনায় থানা হেফাজতে রাখতে ওসিকে অনুরোধ করেছিলাম। তবে পরবর্তীতে মেয়েটিকে থানা হেফাজতে রাখা হয়নি বলে জানতে পেরেছি।












