০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
চিকিৎসা নয় টার্গেট বাণিজ্য দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য
স্টাফ রিপোর্টার
- Update Time : ০৬:২৬:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
- / ৪৭৮ Time View
বগুড়ায় স্বাস্থ্যসেবার নামে বিরাজ করছে চরম অব্যবস্থাপনা। চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসা, প্রতারণা ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন রোগীরা। সারাদেশের মতো বগুড়া শহরের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চলছে রমরমা বাণিজ্য। ফলে বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে উত্তর জনপদের রাজধানী খ্যাত বগুড়ার স্বাস্থ্যসেবা।
জনশ্রুতি রয়েছে, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের টার্গেট করে গড়ে ওঠা এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক গুলোতে অহরহ ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন অজুহাতে ‘সর্বদা সচেষ্ট’ দালালের খপ্পরে পড়েন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বেশিরভাগ মানুষ। রোগী বা সঙ্গে থাকা স্বজনদের সুচিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা আশপাশের নামসর্বস্ব হাসপাতালে কমিশনের বিনিময়ে ভর্তি করে উধাও হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়া শহরতলীতে অনুমোদনহীন গড়ে উঠা অসংখ্য ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করছে এক শ্রেণির দালাল চক্র। তারা নানা কৌশলে সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী ভর্তি করায়। এ কাজে রিকশাচালক ও সিএনজি চালকদের সহায়তা নেয়। বিনিময়ে ক্লিনিক মালিকের কাছ থেকে রোগী ভর্তি বাবদ কমিশন পায় দালাল চক্র। চিকিৎসা সেবার নামে চটকদার সাইনবোর্ডধারী ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্টাফ নেই। এমনকি নার্স, আয়া, চিকিৎসক এবং আধুনিক অপারেশন থিয়েটারও নেই। দালাল চক্রের তৎপরতায় রোগীদের আনাগোনায় লেগে থাকে। শুধু তাই নয়, বড় বড় ডিগ্রীধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছে উল্লেখ করে সাইনবোর্ড, প্যানা বা পোস্টার সাঁটানো হয়।
রোগীদের সরলতার সুযোগে অপচিকিৎসা কেন্দ্র খুলেছেন অসাধু ক্লিনিক ব্যবসায়ীরা। অধিকাংশ ক্লিনিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বসেন না। কখনো কখনো অসুস্থ রোগীর স্বজনদের চাপে চিকিৎসকদের ডেকে আনা হয়। কখন ডাক্তার আসবে, রোগীর স্বজনদের প্রশ্নে চতুর স্টাফরা জানায়, কল করে বাইরে থেকে পছন্দের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে আনতে হবে। সেক্ষেত্রে পৃথকভাবে চিকিৎসকের টাকা দিতে হবে। এখানেই শেষ নয়, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত প্যাথলজি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরিক্ষা না করালে রোগী ও তাদের স্বজনদের বকাঝকাও করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি ক্লিনিকের চাকরিচ্যুত ম্যানেজার জানান, বেশির ভাগে ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধ। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন বা লাইসেন্স নেই। অধিক মুনাফার লোভে প্রয়োজনীয় দক্ষ চিকিৎসক ছাড়াই হাতুড়ে চিকিৎসা বা অপচিকিৎসা দেওয়া হয়। মাঝে মধ্যেই হাসপাতালগুলোতে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ক্লিনিকে ডাক্তার নার্সদের স্বল্পতা রয়েছে। অপারেশন থিয়েটারের আলমারিতে প্রচুর ওষুধ সংরক্ষণ করা হয়, যা নিয়ম বর্হিভূত। কোনোরকম একটি ভবন ভাড়া নিয়েই মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ও রি-এজেন্ট, ভুয়া রিপোর্ট, অদক্ষ ডাক্তার, নার্স এবং নোংরা পরিবেশে পরিচালিত হয় এসব হাসপাতাল ক্লিনিক।
বগুড়া সিভিল সার্জন অফিস সুত্র জানায়, বর্তমানে জেলায় লাইসেন্স প্রাপ্ত মোট ৪৭৯টি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। বন্ধ আছে ৬০টি। সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন করে কিছু ক্লিনিক গড়ে উঠেছে যারা লাইসেন্স পায়নি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেও ৫-৬ বছর নবায়ন করা হয়নি। সেদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকি নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রসূতি মা ও নবজাতকের মূত্যুর ঘটনা ঘটলেও নিবন্ধিত না হওয়ায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কঠোর কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতেও পারছে না।ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর শুধুমাত্র সিলগালা করেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় সারেন।
সরজমিনে বগুড়া শহরের একাধিক ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে রোগী ও তাদের সাথে থাকা স্বজনদের সাথে কথা হয়। তারা চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসা, প্রতারণা ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন। শহরের কালীতলার মোমেনা ক্লিনিক, বিসিকের শাপলা ক্লিনিক, গোহাইল রোডস্থ সুচনা ক্লিনিক, বগুড়া কিডনি ডায়ালোসিস সেন্টার, ঠনঠনিয়া অর জিএস মডেল ক্লিনিক, শান্তপলি ক্লিনিকে প্রয়োজন সংখ্যক চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্টাফ স্বল্পতা রয়েছে। সেগুলোতে সুষ্ঠ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের অভাব চোখে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে এনে বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করা এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরকার অনুমোদিত কালার কোড অনুসরণ করা হয় না। মেডিকেল বর্জ্য নিঃস্মরণ করার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা এনজিও প্রতিষ্ঠান (স্বপ্ন) নির্বাহী পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন নীতিমালায় ১০ বেডের ক্লিনিকে স্টাফনার্স রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিকে অনুসরণ করা হয় না। ভর্তি থাকা রোগীরা সার্বক্ষণিক প্রয়োজনে কোন স্টাফ নার্সকে কাছে না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে বগুড়ার নবাগত সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম আলোর পথকে বলেন, জেলায় অনেক ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে নিয়ম বহির্ভূত চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ আসছে। তালিকা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
Tag :











