০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কাঁচামাল সংকটে পড়বে গণমাধ্যম?

নিয়ন মতিয়ুল
  • Update Time : ০২:২৮:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৬৭ Time View

গণমাধ্যমের একমাত্র কাঁচামাল টাটকা ঘটনা-দুর্ঘটনা। বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ‍উত্তেজনা, আন্দোলন, সংগ্রাম, মারামারি, কাটাকাটি, ধর্ষণ, খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, মববাজি- এ সবই গণমাধ্যমের ব্যবসাকে টিকে রাখে। এখন যদি এসব কমে আসে, বা না থাকে, তাহলে গণমাধ্যমের ব্যবসা জমবে কি?

এমনিতেই গেল দেড়-দুই দশকে গণমাধ্যম খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ঘটনাভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়াও গড়ে উঠেছে বড় বড় বাজেটে। যাদের একমাত্র কাঁচামাল রাজনৈতিক উত্তেজনা-মববাজি। অথচ, সম্প্রতি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চারদিক কেমন ঘোলাটে মনে হচ্ছে। ঘটনার ঘনঘটা যেন ধীরে ধীরে কমে আসছে। এমনটা ঘটলে গণমাধ্যম নির্ঘাত কাঁচামাল সংকটে পড়বে!

যেমন গতকাল বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ‘প্রখ্যাত’ এক চাঁদাবাজকে ধরে এলাকায় ওসির মাইকিং ছিল, “এই যে দেখেন চাঁদাবাজকে ধরেছি। কাউকে চাঁদা দেবেন না।“ আবার ঝালকাঠি-২ আসনের এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোও কয়েকদিন ধরে মাইকিং করে বলছেন, “এই আসনে কোনো চাঁদাবাজের ঠাঁই নেই।”এভাবে সবাই যদি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লাগে তাহলে খুনখারাবিটা হবে কেমনে?

এদিকে, অন্যরকম এক ঘটনা ঘটে গেছে হবিগঞ্জে। বাহুবল থানার ওসিকে গালিগালাজ করা উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে বাসা থেকে আটক করে নিয়ে গেছে ডিবি। ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা সভাপতিকে আটক করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। এমন ঘটনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? সরকারি নেতারা কোণঠাসা হবেন, ওসিরা উড়তে থাকবেন আকাশে। পুলিশকে থ্রেট দিতে এখন থেকে ভয় পাবেন আতিপাতি নেতারা। তাহলে তো ঘটনার বারোটা বাজবে।

আরেকটা ঘটনা গতকাল (২২ ফেব্রুয়ারি) দেখা গেছে সচিবালয়ে। দলবাজ শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের নেতারা গলা ফাটাতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ধরা খেয়েছেন। মন্ত্রীর সাফ কথা, “প্রশ্নই যদি না বুঝেন শিক্ষকতা করবেন কীভাবে?এরপর সতর্ক করে দিয়েছেন, “শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আর রাজপথে নামার প্রয়োজন হবে না।” এখন কথা হচ্ছে, শিক্ষকরা রাস্তায় না নামলে, পুলিশ রঙিন-গরম পানি ছিটিয়ে যে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেন, তা থেকে তো বঞ্চিত হবেন সাংবাদিকরা। দামি ক্যামেরাগুলো অলস পড়ে থাকবে। খবরও আর থাকবে না। দেখা দেবে কাঁচামাল সংকট।

ঘটনা তো এখানেই থেমে নেই। প্রধানমন্ত্রী তো ক্যামেরা আর রিপোর্টারদের খবরের উৎসকেই দিন দিন নাই করে দিচ্ছেন। ভিভিআইপির ভয়ঙ্কর প্রোটোকল আগের মতো আর নেই। ভিআইপি পাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে আগের আমলের মতো গালাগালি, চিৎকার, চেঁচামেচি নেই। হঠাৎ কোন ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি মিশে যাচ্ছে জনতার জটে। এমনটা করলে তো রাজনৈতিক ঘটনাই শূন্য হয়ে যাবে। মানুষের উত্তেজনা কমে শুধুই মুগ্ধতার জন্ম নেবে। তাহলে খবর কেমনে তৈরি হবে?

এর মধ্যেই রোজার সময় মেনে প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকাল ৯টা ৫মিনিটে সচিবালয়ে ঢুকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেললেন। খোঁজ-খবর নিলেন কোন কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা অফিসে এসেছেন। নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশও দিলেন। আর প্রধানমন্ত্রীকে ক্যামেরায় বন্দি করার জন্য যে সাংবাদিক হন্তদন্ত হয়ে সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ছুটে এলেন, তিনিও জেনে হতাশ হলেন যে, ১৫ মিনিট আগেই দৃশ্য চলে গেছে। আহা, কি মুশকিল!

এভাবে যদি চাঁদাবাজি কমে আসে, ক্ষমতাসীন নেতারা ওসিদের ওপর খবরদারি করতে না পারেন, শিক্ষকরা দাবি আদায়ে রাস্তায় না নামেন, মন্ত্রী সচিবরা ঠিক সময়ে অফিসে আসেন, দায়িত্বশীল হন, ঘুষ না খান, ভিভিআইপি পাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে না হয়, তাহলে উত্তেজনা উৎপাদন হবে কীভাবে? সাংবাদিকরা কাঁচামাল পাবেন কোথায়?

তবে ভাবনা নেই, ওসিকে গালাগালি করে যে নেতা আটক হয়েছেন, তিনি নিশ্চিত দল পাল্টাবেন। দলের বিরুদ্ধেই বিশাল ষড়যন্ত্র শুরু করবেন। তখন ঠিক ঠিক খবর তৈরি হবে। একইভাবে যে পুলিশ চাঁদাবাজকে ধরে মাইকিং করেছে, জেল থেকে বেরিয়ে চাঁদাবাজ আগে তাকে ধরবে। তখন খবর তৈরি হবে। যে এমপি এলাকাকে চাঁদাবাজমুক্ত ঘোষণা করছেন, চাঁদাবাজরা তাকেই চাঁদাবাজ বানাবে। যে দলবাজ শিক্ষক নেতাদের বিব্রত করলেন শিক্ষামন্ত্রী, তারা একজোট হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ার সরানোর চেষ্টা করবেন। তখন খালি খবর আর খবর।

আর প্রধানমন্ত্রী যে পশ্চিমা স্টাইলে ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে থেকেও অতি সাধারণ হয়ে উঠেছেন তা আমলাদের, বিরোধী নেতাদের কোনোভাবেই সহ্য হবে না। তারা সবাই মনে মনে ক্ষিপ্ত হবেন। নানা তকমায় ষড়যন্ত্র শুরু করবেন। নিজ দলের মন্ত্রীরাও ‘কামাতে’ না পেরে বিদ্রোহী হয়ে উঠবেন। আর নগর থেকে পল্লীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ নেতাকর্মীও ‘কামানোর’ সুযোগ না পেয়ে ক্ষিপ্ত হবেন। দল করে কিছুই পাচ্ছি না বলে চিৎকার দেবেন। তখন চারদিকে খবরের মিছিল ‍শুরু হবে। সংকট কাটিয়ে গণমাধ্যমে কাঁচামাল সরবরাহ যাবে বেড়ে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

কাঁচামাল সংকটে পড়বে গণমাধ্যম?

Update Time : ০২:২৮:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণমাধ্যমের একমাত্র কাঁচামাল টাটকা ঘটনা-দুর্ঘটনা। বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ‍উত্তেজনা, আন্দোলন, সংগ্রাম, মারামারি, কাটাকাটি, ধর্ষণ, খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, মববাজি- এ সবই গণমাধ্যমের ব্যবসাকে টিকে রাখে। এখন যদি এসব কমে আসে, বা না থাকে, তাহলে গণমাধ্যমের ব্যবসা জমবে কি?

এমনিতেই গেল দেড়-দুই দশকে গণমাধ্যম খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ঘটনাভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়াও গড়ে উঠেছে বড় বড় বাজেটে। যাদের একমাত্র কাঁচামাল রাজনৈতিক উত্তেজনা-মববাজি। অথচ, সম্প্রতি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চারদিক কেমন ঘোলাটে মনে হচ্ছে। ঘটনার ঘনঘটা যেন ধীরে ধীরে কমে আসছে। এমনটা ঘটলে গণমাধ্যম নির্ঘাত কাঁচামাল সংকটে পড়বে!

যেমন গতকাল বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ‘প্রখ্যাত’ এক চাঁদাবাজকে ধরে এলাকায় ওসির মাইকিং ছিল, “এই যে দেখেন চাঁদাবাজকে ধরেছি। কাউকে চাঁদা দেবেন না।“ আবার ঝালকাঠি-২ আসনের এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোও কয়েকদিন ধরে মাইকিং করে বলছেন, “এই আসনে কোনো চাঁদাবাজের ঠাঁই নেই।”এভাবে সবাই যদি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লাগে তাহলে খুনখারাবিটা হবে কেমনে?

এদিকে, অন্যরকম এক ঘটনা ঘটে গেছে হবিগঞ্জে। বাহুবল থানার ওসিকে গালিগালাজ করা উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে বাসা থেকে আটক করে নিয়ে গেছে ডিবি। ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা সভাপতিকে আটক করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। এমন ঘটনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? সরকারি নেতারা কোণঠাসা হবেন, ওসিরা উড়তে থাকবেন আকাশে। পুলিশকে থ্রেট দিতে এখন থেকে ভয় পাবেন আতিপাতি নেতারা। তাহলে তো ঘটনার বারোটা বাজবে।

আরেকটা ঘটনা গতকাল (২২ ফেব্রুয়ারি) দেখা গেছে সচিবালয়ে। দলবাজ শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের নেতারা গলা ফাটাতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ধরা খেয়েছেন। মন্ত্রীর সাফ কথা, “প্রশ্নই যদি না বুঝেন শিক্ষকতা করবেন কীভাবে?এরপর সতর্ক করে দিয়েছেন, “শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আর রাজপথে নামার প্রয়োজন হবে না।” এখন কথা হচ্ছে, শিক্ষকরা রাস্তায় না নামলে, পুলিশ রঙিন-গরম পানি ছিটিয়ে যে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেন, তা থেকে তো বঞ্চিত হবেন সাংবাদিকরা। দামি ক্যামেরাগুলো অলস পড়ে থাকবে। খবরও আর থাকবে না। দেখা দেবে কাঁচামাল সংকট।

ঘটনা তো এখানেই থেমে নেই। প্রধানমন্ত্রী তো ক্যামেরা আর রিপোর্টারদের খবরের উৎসকেই দিন দিন নাই করে দিচ্ছেন। ভিভিআইপির ভয়ঙ্কর প্রোটোকল আগের মতো আর নেই। ভিআইপি পাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে আগের আমলের মতো গালাগালি, চিৎকার, চেঁচামেচি নেই। হঠাৎ কোন ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি মিশে যাচ্ছে জনতার জটে। এমনটা করলে তো রাজনৈতিক ঘটনাই শূন্য হয়ে যাবে। মানুষের উত্তেজনা কমে শুধুই মুগ্ধতার জন্ম নেবে। তাহলে খবর কেমনে তৈরি হবে?

এর মধ্যেই রোজার সময় মেনে প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকাল ৯টা ৫মিনিটে সচিবালয়ে ঢুকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেললেন। খোঁজ-খবর নিলেন কোন কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা অফিসে এসেছেন। নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশও দিলেন। আর প্রধানমন্ত্রীকে ক্যামেরায় বন্দি করার জন্য যে সাংবাদিক হন্তদন্ত হয়ে সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ছুটে এলেন, তিনিও জেনে হতাশ হলেন যে, ১৫ মিনিট আগেই দৃশ্য চলে গেছে। আহা, কি মুশকিল!

এভাবে যদি চাঁদাবাজি কমে আসে, ক্ষমতাসীন নেতারা ওসিদের ওপর খবরদারি করতে না পারেন, শিক্ষকরা দাবি আদায়ে রাস্তায় না নামেন, মন্ত্রী সচিবরা ঠিক সময়ে অফিসে আসেন, দায়িত্বশীল হন, ঘুষ না খান, ভিভিআইপি পাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে না হয়, তাহলে উত্তেজনা উৎপাদন হবে কীভাবে? সাংবাদিকরা কাঁচামাল পাবেন কোথায়?

তবে ভাবনা নেই, ওসিকে গালাগালি করে যে নেতা আটক হয়েছেন, তিনি নিশ্চিত দল পাল্টাবেন। দলের বিরুদ্ধেই বিশাল ষড়যন্ত্র শুরু করবেন। তখন ঠিক ঠিক খবর তৈরি হবে। একইভাবে যে পুলিশ চাঁদাবাজকে ধরে মাইকিং করেছে, জেল থেকে বেরিয়ে চাঁদাবাজ আগে তাকে ধরবে। তখন খবর তৈরি হবে। যে এমপি এলাকাকে চাঁদাবাজমুক্ত ঘোষণা করছেন, চাঁদাবাজরা তাকেই চাঁদাবাজ বানাবে। যে দলবাজ শিক্ষক নেতাদের বিব্রত করলেন শিক্ষামন্ত্রী, তারা একজোট হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ার সরানোর চেষ্টা করবেন। তখন খালি খবর আর খবর।

আর প্রধানমন্ত্রী যে পশ্চিমা স্টাইলে ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে থেকেও অতি সাধারণ হয়ে উঠেছেন তা আমলাদের, বিরোধী নেতাদের কোনোভাবেই সহ্য হবে না। তারা সবাই মনে মনে ক্ষিপ্ত হবেন। নানা তকমায় ষড়যন্ত্র শুরু করবেন। নিজ দলের মন্ত্রীরাও ‘কামাতে’ না পেরে বিদ্রোহী হয়ে উঠবেন। আর নগর থেকে পল্লীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ নেতাকর্মীও ‘কামানোর’ সুযোগ না পেয়ে ক্ষিপ্ত হবেন। দল করে কিছুই পাচ্ছি না বলে চিৎকার দেবেন। তখন চারদিকে খবরের মিছিল ‍শুরু হবে। সংকট কাটিয়ে গণমাধ্যমে কাঁচামাল সরবরাহ যাবে বেড়ে।