কদিন ধরে টানা বৃষ্টি। পাহাড়-পূর্বাঞ্চলে ভারীবর্ষণ, ঢল আর ধসে করুণ পরিস্থিতি। বৃষ্টিতে ভিজেই খুব সকালে তরুণটি অফিসে আসছে। দুর্দান্ত মেধাবী তরুণটির মুখের দিকে যতবার তাকাই বুকটা মোচড় দেয়। ইস্, আরেক মেধাবীর ‘অনিশ্চিত’ যাত্রা আবার সহ্য করতে হবে! নামধাম জানার পর ভাবছি, ওকে মিডিয়ার প্রথম পাঠটা দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে? বলতে কি পারবো, দেশে মিডিয়া বলে কিছুই নেই, সবই ‘দলবাজি’! মিডিয়ায় প্রায় সবই যে ‘ভণ্ডামি’ তা কি বলা সম্ভব!
কি আশ্চর্য!ভাবতে ভাবতেই দেখি তরুণটি একদম সামনে। বলছে, ‘ভাইয়া কী যেন বলতে চেয়েছিলেন?বলুন, প্লিজ।' নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘না মানে, মিডিয়া নিয়ে প্রথম পাঠ তোমাকে শেখানো উচিত।' বললো, ‘প্লিজ, আপনাদের কাছ থেকে কিছু জানতে-শিখতে চাই। ’
কৌতুহল দেখে মনটা চনমন করে উঠলো। গদগদ হয়ে বলতে লাগলাম, ‘তোমার তো ব্যাকগ্রাউন্ড জার্নালিজম নয়। তাই সবার আগে দেশীয় মিডিয়ার প্রকারভেদ জানতে হবে। কোন মিডিয়া কী কী কাজ করে- সে সম্পর্কে জানা দরকার।' সে আরও কৌতুহলী হয়ে উঠলো।
২.
বললাম, ‘দেশীয় মিডিয়াকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। আমিডিয়া, জামিডিয়া, ধামিডিয়া আর বামিডিয়া। অনেকে এই চারটির সঙ্গে আরও দুটো যুক্ত করে- লামিডিয়া আর মুমিডিয়া। মোটাদাগে বলতে পারো ছয় ধরনের মিডিয়াই ফ্যাংশন করছে দেশে।
প্রশ্নবোধক চোখে সে বললো, ভাইয়া, মিডিয়ার আগে ‘আ’ ‘জা’ ‘ধা’ ‘বা’ ‘লা’ ‘মু’ এসব কী?’ হেসে বললাম, ‘আ’ মানে ‘আওয়ামী’, ‘জা’ মানে জাতীয়তাবাদী, ‘ধা’ মানে ধার্মিক আর ‘বা’ মানে বামধারা। ‘লা’ এসেছে লাঠিয়াল আর ‘মু’ এসেছে মুনাফামুখী থেকে। সে কৌতুহলী। বলল, ‘এমন শব্দ তো আগে শুনিনি।’
বললাম, ‘টপ সিক্রেট। একাডেমিকভাবে কেউ এসব শেখায় না। মাঠে নেমেই শিখতে হবে। বললো, এসব মিডিয়া কেমন? বললাম, এটা খুবই সিরিয়াসলি জানা উচিত। কারণ তুমি যে হাউজে কাজ করবে, সেটা কোন শ্রেণির জানলেই বুঝতে পারবে, সেখানে কী কী করতে হবে। সে মনোযোগী হলো।
৩.
বললাম, প্রথমত আমিডিয়া হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিভাবক। তারা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ও ‘স্বাধীনতার পক্ষের’ একমাত্র প্রতিনিধি। তাদের বিশ্বাস, যারা আওয়ামী সমর্থক, তারাই একমাত্র স্বাধীনতা-প্রেমী, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক। বিপক্ষের সবাই ‘পাকিস্তানপন্থি’, ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি’। নিউজে প্রতিপক্ষের আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাস’, ‘জনবিরোধী’ লেবেল দেয়। আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যর্থতাকে ‘বিশ্ব পরিস্থিতি’, ‘ষড়যন্ত্র’, ‘অপ্রত্যাশিত ঘটনা’ হিসেবে ফ্রেম করে। আবেগঘন হিসেবে ‘শহীদ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘স্বাধীনতা বিরোধী’-এগুলো ঘন ঘন প্রয়োগ করে।
তরুণটির চোখ ছানাবড়া। বলল, জামিডিয়া কী করে? বললাম, ‘সুশাসন আর গণতন্ত্রের রক্ষক’ হিসেবে ‘গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা ও মুক্তবাজার অর্থনীতির’ পক্ষে ফ্রেমিং করে। আওয়ামীকে ‘স্বৈরাচারী’, ‘ভোটচুরির দল’ আর ‘গণতন্ত্রহীন’ হিসেবে উপস্থাপন করে। আওয়ামী সরকারের পদক্ষেপকে ‘জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া’ আর নিজেদের আন্দোলনকে ‘জনমুক্তির আন্দোলন’ হিসেবে ফ্রেম করে। ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’, ‘বাকস্বাধীনতা’, ‘বিচারিক স্বাধীনতা’-এসব শব্দ বেশি বেশি ব্যবহার করে।
তরুণটির চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, তবে মজার কথা কি জানো, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে থাকা জাতীয়তাবাদী নেতারা চাচ্ছেন না ‘বিসাংবাদিক’ বলে কিছু থাক। সে হিসেবে ধরে নিতে পারো তারা বিমিডিয়ার চরিত্র নিয়েও বোধ করি বিরক্ত!
৪.
সে যাক, এখন আসো ধামিডিয়ার আলাপে। ‘ইসলামি শাসন আর ইনসাফের অগ্রদূত’ হিসেবে ধামিডিয়া দেশের সব সমস্যার মূলে ‘সেকুলারিজম’, ‘ওয়েস্টার্ন কালচার’ আর ‘লিবারেলিজমকে’ দায়ি করে। সমাজে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ ইসলামি বিধান বলে তাদের বিশ্বাস। দেশকে ‘আফগান মডেল’ বা ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রে’ কনভার্ট করতে তারা সম্মতি উৎপাদন করে। ধামিডিয়া ছাড়া বাকি সব মিডিয়াকে তারা ‘ওয়েস্টার্নাইজড’, ‘মুরতাদ’ বা ‘সেকুলার এজেন্ট’ হিসেবে ফ্রেমিং করে। নিউজে ‘তওবা’, ‘ইসলামি বিপ্লব’, ‘শরিয়া’, ‘ইনসাফ’ আবেগময় হিসেবে বেশি বেশি ব্যবহার করে।
তরুণটি বললো, ভাইয়া মিডিয়াগুলো এমন হয় কেন? বললাম, তুমি কি কখনও কারো প্রেমে পড়েছিলে? সে লজ্জায় মুখ নামাল।
বললাম, এবার বামিডিয়ার প্রসঙ্গ। তারা ‘শ্রমিক-কৃষক-জনতার একমাত্র কণ্ঠস্বর’ হিসেবে ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’, ‘পুঁজিবাদবিরোধী’, ‘শোষিত মানুষের পক্ষের’ শক্তির ফ্রেমিং করে। তাদের ফ্রেমে আওয়ামী ও জাতীয়তাবাদী-উভয় পুঁজিবাদি শক্তি, একই মুদ্রার দুই পিঠ। তারা সবকিছুতে ‘অর্থনৈতিক বৈষম্য’, ‘ভূমিদস্যুতা’, ‘আন্তর্জাতিক অর্থঋণ ষড়যন্ত্র’ দেখে। নিউজে আবেগের সঙ্গে ‘শোষণ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘নিওলিবারেলিজম’, ‘শ্রমিক অধিকার’ ব্যবহার করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরা কখনও আওয়ামী, কখনও জাতীয়তাবাদের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়ায়!
৫.
শুনে তরুণটি হেসে ওঠে। বলি, হাসাহাসির নয়, পুরোপুরিই তাত্ত্বিক বিষয়। তরুণটা বললো, ভাইয়া, এখন থাকলো লা আর মু। হেসে বলি, আগে জমিদাররা জমাজমি রক্ষায় লাঠিয়াল বাহিনী রাখতো। এখন কিছু করপোরেট মেগা কোম্পানি লাঠিয়াল হিসেবে সাংবাদিকদের পোষে। সেগুলোই হচ্ছে লামিডিয়া। আর কিছু মিডিয়া এনজিরও মতো সামাজিক ব্যবসা করে। এরা পাইকারী থেকে শুরু করে নিউজের এক্সপোর্ট ইমপোর্টও করে। পাঠক বা অডিয়েন্সের মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে মুনাফাটাই তাদের কাছে বড়। এরাই মুমিডিয়া।
তরুণটির কৌতুহল বেড়ে গেল। প্রশ্ন করলো, আমরা যে মিডিয়ায় এখন কাজ করছি, সেটা কোন ধারার ভাইয়া? মুশকিলে পড়ে গেলাম। বললাম, প্রশ্নটা খুবই সিক্রেট, উত্তরটা আরও বেশি সেনসেটিভ। এমন প্রশ্নের উত্তর নিজেকেই খুঁজতে হয়। এবার সে বললো, আচ্ছা ভাইয়া, তরুণদের নিয়ে কোন মিডিয়ার কেমন ভাবনা, সেটা জানতে ইচ্ছে করছে। বললাম, ওটা দ্বিতীয় পার্ট, আগামীকাল জানাব।
এর মধ্যেই তরুণটির ফোন বেজে উঠলো। বললাম, কলটা আগে ধরো। বলতেই পাশ থেকে সঙ্গিনী ধাক্কা দিল। এই ওঠো, তোমার ফোন বাজছে। চমকে বিছানায় উঠে বসলাম। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তরুণটি বলল, বৃষ্টিতে ভিজেই অফিসে এসেছি। এখনও কেউ আসেনি। বললাম, কাজ শুরু করো, সবাই আসবে। রুমের থাই জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম বাইরে ঝুম বৃষ্টি।
(মিডিয়ার আষাঢ়ে গল্প: ১২ জুলাই, ২০২৬। সেন্ট্রাল রোড, ঢাকা)