১০:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির চরিত্র কতটা পাল্টে দিল গণমাধ্যম?

নিয়ন মতিয়ুল
  • Update Time : ০২:১৫:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৪৫৭ Time View

দেশের রাজনীতি আর দলগুলো নিয়ে সাংবাদমাধ্যমের সুদূরপ্রসারী ভাবনা-পরিকল্পনা কী? রাজনৈতিক বিটের রিপোর্টাররা কী লিখছেন, কেন লিখছেন? গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণে দেশীয় রাজনীতির নীতি বা চরিত্রের কোনো বদল ঘটেছে? দশকের পর দশক ধরে লেখা হাজার হাজার বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ রাজনৈতিক প্রতিবেদন দলগুলোর গণতান্ত্রিক চর্চার পথে কতটা সহায়ক হয়েছে? টিভির হাজার হাজার টকশো রাজনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গির কতটুকু বদল এনেছে? দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা কি আগের চেয়ে বেড়েছে না কমেছে? নেতাকর্মীদের দলান্ধত্ব, সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব কতটা কমানো গেল?

এসব বহুমুখী প্রশ্ন নিয়ে দেশে একাডেমিক কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই। তবে পিআইবি, এমআরডিআই, নিউজ নেটওয়ার্ক, বিসিডিজেসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে যেসব রিপোর্টারকে পলিটিক্যাল রিপোর্টিং শিখিয়েছে তারা অনেকেই গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারক হয়ে গেছেন। এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সাংবাদিকতা নিয়ে বিশ্বমানের কলাকৌশল চর্চা করাচ্ছে। ইনহাউজ বা ক্লোজডোর অনেক স্ট্র্যাটেজিও রপ্ত করানো হচ্ছে। তাই, সরকারি, বেসরকারি বা একাডেমিক পর্যায়ের এসব প্রশিক্ষণ দেশীয় রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রেখেছে বা রাখছে তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বিশেষত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগগুলো এসব নিয়ে গবেষণা বা বিশ্লেষণ করতে পারে। যাতে পলিটিক্যাল রিপোর্টিং বিষয়ে একাডেমিক প্ল্যান বা ট্র্যাটেজির আধুনিকায়ন বা যুগপোযুগী করা সম্ভব হয়। সেটা করা না গেলে গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে সমাজে বা জনপরিসরে ভুল বার্তা যাবে। জনআস্থার জায়গায় যেমন ফাটল সৃষ্টি হবে, তেমনি গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের ভরসা উঠে যেতে পারে।

আমাদের সমাজে প্রাকৃতিকভাবেই গোষ্ঠীচেতনা প্রবলরকম। পরিবার, দল, ধর্ম— সবক্ষেত্রেই ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা। যে প্রবণতা রাজনীতিতেও গেড়ে বসেছে। যে কারণে যুক্তি বা মতবিরোধের চেয়ে আবেগ আর আনুগত্যই এখানে মূখ্য। সামাজিক এমন বুননের কারণেই দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দশকের পর দশক ধর ‘জিরো-সাম গেমে’ (একজনের লাভ, অন্যজনে ক্ষতি) লিপ্ত ছিল। এক দল ক্ষমতায় থাকলে অন্যদল সব বর্জন করতো। কোনো দল ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রযন্ত্র তথা প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতো। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই ছিল শত্রুতা। যা সহনশীলতা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে রাজনীতি পরিণত হয়েছে অর্থ ও প্রভাবের খেলায়। ক্ষমতায় থাকা মানে সুযোগ, টেন্ডার, নিয়োগ, সুবিধা পাওয়া। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে তাই সহিংস প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যায়। যে ভয় থেকেই স্বদলীয় অপরাধকে দণ্ডহীন করা হয়। বিচারব্যবস্থাকেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা হয়। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত দলীয়করণ হয়। প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী দল এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, সহিংসতা স্থায়ী রূপ নেয়। এমন বাস্তবতায় দলের ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চা থেমে যায়। নেতাকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রবল হয়ে ওঠে। বিরোধিতা মানে বিদ্রোহ, সমালোচনা মানে দলত্যাগ— এমন মানসিকতা গড়ে ওঠে।

দেশীয় রাজনীতির এমন ধ্বংসাত্মক চরিত্রের বদল ঘটাতে একমাত্র ভরসা গণমাধ্যম। যারা দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা পুনর্গঠন করতে পারে। দলীয় কাঠামোর ভেতর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে কিনা, তা অনুসন্ধান করতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও আস্থা পুনর্গঠনে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে জাগিয়ে তুলতে পরে। বর্ণনা, বক্তব্যধর্মী অথবা নির্বাচন কেন্দ্রিক নেতার প্রশস্তি বা সমালোচনামূলক গড়পড়তা একঘেঁয়ে প্রতিবেদনের বাইরে এসে বিশ্লেষণী ও অনুসন্ধানি প্রতিবেদন দরকার। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে জনগণের প্রকৃত ভাষ্য প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা যেতে পারে।

‘আমার দল না থাকলে দেশ শেষ হয়ে যাবে’– এমন মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। কোন দল কীভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, করব্যবস্থা বা পররাষ্ট্রনীতি চালাবে সেটাই মূখ্য আলোচনার বিষয়। প্রতীকের চেয়ে নীতি বা কর্মফল দেখে যেন ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সেই দিকে ফোকাস করতে হবে। নেতা-কেন্দ্রিক ও আবেগনির্ভর সহিংস রাজনীতির বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের দিকে নজর দিতে হবে গণমাধ্যমকে। বিরোধী দলগুলো যেন সংসদীয় সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ মিটিয়ে ফেলতে পারে সেই আলাপে জোর দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা না দিয়ে বরং বিকল্প চিন্তাধারার প্রতিনিধি হিসেবে যেন দেখা হয়, মতবিরোধ থাকলেও রাষ্ট্রের মৌল কাঠামো বা শৃঙ্খলা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই মানসিকতা গড়ে দিতে পারে গণমাধ্যম।

 

নিয়ন মতিয়ুল

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

রাজনীতির চরিত্র কতটা পাল্টে দিল গণমাধ্যম?

Update Time : ০২:১৫:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫

দেশের রাজনীতি আর দলগুলো নিয়ে সাংবাদমাধ্যমের সুদূরপ্রসারী ভাবনা-পরিকল্পনা কী? রাজনৈতিক বিটের রিপোর্টাররা কী লিখছেন, কেন লিখছেন? গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণে দেশীয় রাজনীতির নীতি বা চরিত্রের কোনো বদল ঘটেছে? দশকের পর দশক ধরে লেখা হাজার হাজার বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ রাজনৈতিক প্রতিবেদন দলগুলোর গণতান্ত্রিক চর্চার পথে কতটা সহায়ক হয়েছে? টিভির হাজার হাজার টকশো রাজনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গির কতটুকু বদল এনেছে? দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা কি আগের চেয়ে বেড়েছে না কমেছে? নেতাকর্মীদের দলান্ধত্ব, সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব কতটা কমানো গেল?

এসব বহুমুখী প্রশ্ন নিয়ে দেশে একাডেমিক কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই। তবে পিআইবি, এমআরডিআই, নিউজ নেটওয়ার্ক, বিসিডিজেসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে যেসব রিপোর্টারকে পলিটিক্যাল রিপোর্টিং শিখিয়েছে তারা অনেকেই গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারক হয়ে গেছেন। এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সাংবাদিকতা নিয়ে বিশ্বমানের কলাকৌশল চর্চা করাচ্ছে। ইনহাউজ বা ক্লোজডোর অনেক স্ট্র্যাটেজিও রপ্ত করানো হচ্ছে। তাই, সরকারি, বেসরকারি বা একাডেমিক পর্যায়ের এসব প্রশিক্ষণ দেশীয় রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রেখেছে বা রাখছে তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বিশেষত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগগুলো এসব নিয়ে গবেষণা বা বিশ্লেষণ করতে পারে। যাতে পলিটিক্যাল রিপোর্টিং বিষয়ে একাডেমিক প্ল্যান বা ট্র্যাটেজির আধুনিকায়ন বা যুগপোযুগী করা সম্ভব হয়। সেটা করা না গেলে গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে সমাজে বা জনপরিসরে ভুল বার্তা যাবে। জনআস্থার জায়গায় যেমন ফাটল সৃষ্টি হবে, তেমনি গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের ভরসা উঠে যেতে পারে।

আমাদের সমাজে প্রাকৃতিকভাবেই গোষ্ঠীচেতনা প্রবলরকম। পরিবার, দল, ধর্ম— সবক্ষেত্রেই ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা। যে প্রবণতা রাজনীতিতেও গেড়ে বসেছে। যে কারণে যুক্তি বা মতবিরোধের চেয়ে আবেগ আর আনুগত্যই এখানে মূখ্য। সামাজিক এমন বুননের কারণেই দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দশকের পর দশক ধর ‘জিরো-সাম গেমে’ (একজনের লাভ, অন্যজনে ক্ষতি) লিপ্ত ছিল। এক দল ক্ষমতায় থাকলে অন্যদল সব বর্জন করতো। কোনো দল ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রযন্ত্র তথা প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতো। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই ছিল শত্রুতা। যা সহনশীলতা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে রাজনীতি পরিণত হয়েছে অর্থ ও প্রভাবের খেলায়। ক্ষমতায় থাকা মানে সুযোগ, টেন্ডার, নিয়োগ, সুবিধা পাওয়া। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে তাই সহিংস প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যায়। যে ভয় থেকেই স্বদলীয় অপরাধকে দণ্ডহীন করা হয়। বিচারব্যবস্থাকেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা হয়। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত দলীয়করণ হয়। প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী দল এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, সহিংসতা স্থায়ী রূপ নেয়। এমন বাস্তবতায় দলের ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চা থেমে যায়। নেতাকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রবল হয়ে ওঠে। বিরোধিতা মানে বিদ্রোহ, সমালোচনা মানে দলত্যাগ— এমন মানসিকতা গড়ে ওঠে।

দেশীয় রাজনীতির এমন ধ্বংসাত্মক চরিত্রের বদল ঘটাতে একমাত্র ভরসা গণমাধ্যম। যারা দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা পুনর্গঠন করতে পারে। দলীয় কাঠামোর ভেতর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে কিনা, তা অনুসন্ধান করতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও আস্থা পুনর্গঠনে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে জাগিয়ে তুলতে পরে। বর্ণনা, বক্তব্যধর্মী অথবা নির্বাচন কেন্দ্রিক নেতার প্রশস্তি বা সমালোচনামূলক গড়পড়তা একঘেঁয়ে প্রতিবেদনের বাইরে এসে বিশ্লেষণী ও অনুসন্ধানি প্রতিবেদন দরকার। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে জনগণের প্রকৃত ভাষ্য প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা যেতে পারে।

‘আমার দল না থাকলে দেশ শেষ হয়ে যাবে’– এমন মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। কোন দল কীভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, করব্যবস্থা বা পররাষ্ট্রনীতি চালাবে সেটাই মূখ্য আলোচনার বিষয়। প্রতীকের চেয়ে নীতি বা কর্মফল দেখে যেন ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সেই দিকে ফোকাস করতে হবে। নেতা-কেন্দ্রিক ও আবেগনির্ভর সহিংস রাজনীতির বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের দিকে নজর দিতে হবে গণমাধ্যমকে। বিরোধী দলগুলো যেন সংসদীয় সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ মিটিয়ে ফেলতে পারে সেই আলাপে জোর দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা না দিয়ে বরং বিকল্প চিন্তাধারার প্রতিনিধি হিসেবে যেন দেখা হয়, মতবিরোধ থাকলেও রাষ্ট্রের মৌল কাঠামো বা শৃঙ্খলা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই মানসিকতা গড়ে দিতে পারে গণমাধ্যম।

 

নিয়ন মতিয়ুল