প্রাগৈতিহাসিক যুগে নতুন তথ্য ছিল বাঁচা বা আত্মরক্ষার সুযোগ। শিকার বা শত্রু কোথায়, কোন ফল বিষাক্ত বা ভক্ষণযোগ্য-এসব তথ্য ছিল বাঁচা-মরা তথা অস্তিত্বের লড়াই। তাই নতুন তথ্য খুঁজতে তাড়িত হতো আদিম মানুষ। লাখ লাখ বছরের বহন করা সেই প্রবৃত্তিতেই মেইনস্ট্রিম মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ার অসীম তথ্য বা ‘ইনফিনিট স্ক্রলে’ আটকে যাচ্ছে আধুনিক পাঠক বা অডিয়েন্স।
মানব মস্তিষ্কের প্রবণতা বা জিনগত বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে আদিম শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে। ২-৩ লাখ বছর ধরে সেই জিনগত কাঠামো বহন করছে মানুষ। আধুনিক সমাজে খাদ্য, যৌনতা, নিরাপত্তা— আদিমরূপে আর নেই। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি বা বৈশিষ্ট্যে দেখা দিচ্ছে। অথচ আমাদের মস্তিষ্ক কাজ করছে এখনো প্রাচীন ‘অ্যালগরিদম’ দিয়ে।
আমাদের কৃষি, শিল্পবিপ্লব, প্রযুক্তি —সবই ঘটেছে মাত্র কয়েক হাজার বছরে। যার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না আমাদের জেনেটিক পরিবর্তন। ফলে মস্তিষ্ক এখনো অনেকটাই আদিম পরিবেশের উপযোগী। আধুনিক সামাজিক স্বীকৃতি তথা সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক মস্তিষ্কে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতি সমাজের ‘গ্রহণযোগ্যতা’ হিসেবে ধরে নেয়। মস্তিষ্কের আদিম অ্যালগরিদমের কারণে সোশ্যাল মিডিয়া তাকে ফাঁদে ফেলে দেয়।
আদিম উপজাতি জীবনে কে মানুষকে গ্রহণ করছে আর কে প্রত্যাখ্যান করছে, তা ছিল জীবন-মরণের ব্যাপার। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, কমেন্ট, শেয়ার সেই একই প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করছে। নতুন পোস্ট, নোটিফিকেশন, লাইক পেলে মস্তিষ্কের ডোপামিন উত্তেজিত হয়। বলে, ‘আহা! এমন অনুভূতি ফের চাই।’ ফলে সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠে জুয়ার মেশিন! কখন, কী পাবেন তা নিশ্চিত না, তবে সামান্য পুরস্কারেই মস্তিষ্ক উজ্জীবিত হয়।
বিস্ময়কর তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বদল ঘটছে। অথচ মস্তিষ্ক চলছে সেই আদিম অ্যালগরিদমেই। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বুদ্ধি বলছে, এটা ক্ষতিকর। আর ডোপামিন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে মনোযোগের ভাঙন তীব্র হচ্ছে। গভীর চিন্তায় থাকতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক কিছু পড়া হলেও মনে তার দাগ পড়ছে না। লাইক বা কমেন্ট মুড সুইং করছে। একটা নিউরোকেমিক্যাল লুপে আটকে যাচ্ছে মানুষ। যা এক ভয়ঙ্কর আসক্তির শৃঙ্খল।
লেখক: নিয়ন মতিয়ুল