দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকরা মন্ত্রীর সমমর্যাদা পান। যুক্তরাষ্ট্রে পান ভিআইপি মর্যাদা। ফিনল্যান্ডে শুধুমাত্র সেরা শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। জাপানের যে এলাকায় শিক্ষক থাকেন, সেখানে উচ্চ শব্দ নিষিদ্ধ। ফ্রান্সের আদালতে শিক্ষকদের চেয়ারে বসার বিশেষ অধিকার রয়েছে। আর বাংলাদেশে?কয়েক টাকা বেতন বাড়াতে রাজপথে নামলেই লাঠিপেটা!হাত-পা ভেঙে রক্তাক্ত করতেও দ্বিধা করা হয় না!
তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশে শিক্ষকদের গড় মাসিক বেতন মাত্র ২০ হাজার টাকা। যা শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, সম্ভবত গোটা বিশ্বেই প্রায় সর্বনিম্ন। প্রতিবেশী ভারতে শিক্ষকদের বেতন ৩৪ হাজার টাকার উপরে, নেপালে ২৫ হাজার+, ভুটানে ৩৫ হাজার+, শ্রীলঙ্কায় ৬০ হাজার+, মালদ্বীপে ১৪০ হাজার+, মালয়েশিয়ায় ৮৬-২২৮ হাজার+, থাইল্যান্ডে ১০০-১৮০ হাজার টাকা+। এমনকি মিয়ানমারের মতো দেশেও শিক্ষকরা পান বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বেতন।
বাংলাদেশে ১১-১২ হাজার টাকার স্কেল বাড়িয়ে ১৬ হাজারের দাবি নিয়ে রাজপথে নামায় লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেডে শতাধিক শিক্ষক আহত হয়েছেন। যে প্রশাসক পুলিশকে লাঠিপেটার আদেশ দিয়েছেন, সম্ভবত তিনি নিজে বা তার সন্তানরা সরকারি প্রাথমিকে পড়ে না। তবে যেসব পুলিশ শিক্ষকদের পিটতে বাধ্য হয়েছেন, তার সন্তানরা কিন্তু সরকারি প্রাথমিক পড়ে। তার মানে অভিভাকদের দিয়ে শিক্ষকদের পেটালো সরকার?
অবশ্য, শিক্ষকদের মারধর, চেয়ার দখল, কানধরে উঠবস আর দিগম্বর করার ইতিহাসের শ্রষ্ঠা ব্যাকবেঞ্চার রাজনীতিকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দালাল বানানো, রাজনৈতিক নেতার মতো গর্জন করানো, দেশের মেধাবী স্মার্ট শিক্ষার্থীদের দলীয় সন্ত্রাসী বানানোর সীমাহীন অবদান ব্যাকবেঞ্চারদেরই। বর্তমানে শিক্ষকদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, সেটা তো দেখি আগের আমলের রিমেক।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর রাজনীতিকরা সবার আগে ছুটে গিয়ে দখলে নিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। নিজে সভাপতি হয়েছেন, নয়তো ভাই-বোন-বউকে বসিয়েছেন। যেন নিয়োগ বাণিজ্য, প্রকল্প বাণিজ্য, কমিশন বাণিজ্য, স্বজনবাণিজ্য করা যায়। কারণ, যত বড় নেতাই হোক না কেন, তারা কখনই চান না দেশে মেধাবী প্রজন্ম গড়ে উঠুক, তারা গবেষক বা বিজ্ঞানী হোক। পড়া শেষেই মেধায় নিয়োগ পেয়ে যাক। তাতে রাজনীতিকদের দাম কমে যায়। কারণ, মেধাবীদের শাসন করার বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা তাদের নেই।
দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ, গবেষকরা দশকের পর দশক ধরে দেশের শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর (৫ শতাংশ) পরামর্শ দিলেও কোনোদিন তা শোনেননি রাজনীতিকরা। ২০২৩ সালে শ্রীলংকা যখন দেউলিয়া তখনও শিক্ষায় তাদের বরাদ্দ বাংলাদেশের সমান ১.৮ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারতে বরাদ্দ ৪-৫ শতাংশ, নেপালে ৩-৪ শতাংশ, ভুটানে ও মালদ্বীপে ৫-৬ শতাংশ। এমনকি আফগানিস্তানেও বরাদ্দ ৪-৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দ মাত্র ১-২ শতাংশ। দেশকে সিঙ্গাপুর বানাতে চাওয়া নেতারা গত ২২ বছর ধরে শিক্ষায় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার তলানিতে রাখার গৌরব অর্জন করেছেন!
দেশীয় রাজনীতিক, ক্ষমতাসীন দলগুলো নতুন প্রজন্মকে মেধাবী গবেষক, বিজ্ঞানী, দায়িত্বশীল ও স্মার্ট নাগরিক বানানোর বদলে পাতি নেতা, ঠিকাদার, ভেজাল ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি বানিয়েছে। যারা গণমাধ্যমকে দালালে, আইনজীবীদের দাসে আর শিক্ষকদের শিক্ষা নামের মুদি দোকানের বিক্রেতা বানিয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে দেশকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণায় পিছিয়ে রেখে, সম্ভাবনাময় নাগরিকদের রাজনীতির আফিম খাইয়ে দলান্ধ, উন্মাদ, মূর্খতার চাষ করে যাচ্ছেন। যেখানে জাতির কারিগররা নামমাত্র বেতন বাড়ানোর দাবি জানালে রক্তাক্ত করা হয়!কারণ, এআইয়ের যুগে দেশীয় রাজনীতির টুলস এখনও সেই রামদা, চাপাতি, ছুরি, লাঠি...সঙ্গে চাপাবাজি!