০৪:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বগুড়ায় মানুষ কেনাবেচার হাট, দর কষাকষিতে বিক্রি হয় শ্রম আর স্বপ্ন

মোঃ এমদাদুল হক রনি
  • Update Time : ০৬:৫১:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৬০৯ Time View

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":3,"adjust":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

​বগুড়ায় বিভিন্ন পথে প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে এক মর্মস্পর্শী হাটের সূচনা হয়। স্থানীয়দের কাছে কামলার হাট নামে পরিচিত হলেও এটি মূলত সংগ্রামীজীবন ও কঠোর পরিশ্রমের এক নীরব জনপদ। হাটে কোনো পণ্য নয় বরং গায়ের শক্তি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ বেচাকেনা হয়। একেবারে পণ্যের মতোই চলে দর কষাকষি।
​এই হাটগুলোতে প্রতিদিন বিক্রি হয় নিম্ন আয়ের মানুষের শ্রম, ঘাম, মর্যাদা আর স্বপ্ন। জীবন ও জীবিকার কঠিন তাগিদে আসা এই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় বেচাকেনা, যা চলে সকাল ৯ টা পর্যন্ত।
​বগুড়া শহরের কলোনি বাজার,নামাজগড় মোড়, তিনমাথা, মাটিডালি বিমান মোড়, বাদুরতলা রাস্তা, চেলোপাড়া মধুবন সিনেমা হলের সামনে, ,গোদারপাড়া বাজার এবং চেলোপাড়া ব্রিজের পাশে বসে এই অদ্ভুত হাট। শুধু শহরে নয়, শেরপুর, ধুনট, সারিয়াকান্দি এবং মহাস্থানেও এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
​এগুলো হাটে দুই শ্রেণির মানুষের সমাগম ঘটে: একদল আসে শ্রম বিক্রি করতে, আরেকদল আসে সেই শ্রম কিনতে। ধানের চারা রোপণ, নিড়ানি,ধান কাটা-মাড়াই, রাজমিস্ত্রি, মাটিখনন, ড্রেনেজ পরিষ্কার থেকে শুরু করে ভারী কাজের জন্য দিন চুক্তিতে শ্রমিক নেওয়া হয়। শরীরের শক্তি থাকলে তাদের চাহিদা বাড়ে; অন্যথায় অনেকেই হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
​বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই এসব হাটে মানুষের ঢল নামে। ঘুম ঘুম চোখে, গ্রামের মাটির গন্ধ মেখে পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে হাজির হয় দিনমজুরের ঝাঁক। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট তাদের চোখে-মুখে। প্রতিটি মুখ যেন একেকটি ব্যর্থ জীবনের গল্প বলে যায় নিঃশব্দে। গৃহস্থরা কাজ সম্পন্ন করার চুক্তিতে কিংবা দিন কর্মঘণ্টা হিসেবে এই শ্রমিকদের কাজে নেন।এসব কাজে অংশ নেন খেটে খাওয়া পুরুষের সাথে অসহায় নারীরা।
​শহরের বাসিন্দারা জানান, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই নিম্ন আয়ের মানুষজন হাতে কোদাল ও ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। ক্রেতারা দরদাম করে দেখেশুনে শ্রমিক নিয়ে যান, তবে শত শত মানুষ উপস্থিত হলেও, সবার ভাগ্যে প্রতিদিন কাজ জোটে না। কাজ না পেলে অনাহারে কাটে তাদের দিন।
এদিক ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ এই কামলার হাটে আসেন। হাতে ব্যাগ আর বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। একেবারে পণ্যের মতো দর কষাকষিতে বিক্রি হন শ্রমজীবী মানুষ। এক স্থানে একত্রে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, যেকারণে ক্রেতার উপস্থিতিও বাড়ে। তারা দরদাম করে দেখেশুনে শ্রমিক নিয়ে যান। তবে পুরুষের তুলনায় নারীদের মজুরি কিছুটা কম।
কলোনি বাজারে বয়স্ক লোক এসেছে এনামুল শ্রম বিক্রি করতে। বয়স বাড়ছে, শরীরের শক্তিও কমছে। পেটের দায়ে দীর্ঘ ১২ বছর এখানে আসপন। আগের মতো ভারী কাজ করতে অসুবিধা হয়। আবাদি জমির পরিচর্যার কাজ করেন। কাজ যদি না পায় সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়।
মামুন নামের একজন বলেন, তিনমাথা হাটে এলে গায়ে বল থাকতে হয়। বল না থাকলে কেউ কিনে না। আর বিক্রি না হলে তখন সংসার চলে না। ধারদেনা করে চলতে হয়। ভাগ্য যেদিন সহায় হয়, সেদিন কাজ পাওয়া যায়। সব ধরনের কাজ করি। অনেক গৃহস্থ ৮ ঘণ্টার জায়গায় ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করে নেয়। কেউ কেউ ভালো আচরণ করলেও অনেকে খারাপ আচরণ করে।
শিবগঞ্জ থেকে হাটে এসে রহমান বলেন, জীবন আর জীবিকার জন্য এখন এই হাটেই নিজের শরীর বিক্রি করি। কাজ করে দিনের মজুরি কখনো ৬শ টাকা, কখনো ৮শ টাকা পাই।
নন্দীগ্রামের হোসেন বলেন, ধান কাটার মৌসুম এসেছে, এখন নিজের এলাকায় দাম বাড়বে। তখন কামলার হাটে শ্রমিকদের উপস্থিতিও কমবে। সমাজে অন্যান্য কাজ করা মানুষগুলো যতটুকু সম্মান পায়, আমরা সেই সম্মান পাই না। নিজে চলতে হয়, সাংসারিক খরচ মেটাতে হয়। আমার দিকে তাকিয়ে থাকে পুরো পরিবার।
শ্রম বিক্রি করতে আসা কয়েকজন নারী জানান, চেলোপাড়া হাটে প্রতিদিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক কর্মস্থলে কাজ শুরুর সময় থাকলেও শেষের নির্দিষ্ট সময় থাকে না। অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কোনো রকমে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে টিকে আছি।
যারা শ্রম কিনে নেন তাদের একজন রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান,শহরে কাজের লোকজনের অভাব রয়েছে। তবে দূর থেকে এসে এমন হাটে কাজ করতে আসেন। আমার মতো অনেকেই এসব শ্রমিক দিয়ে কাজ করায়, এতে আমাদের অনেক উপকার হয়।
শক্তি আর শ্রম নির্ধারণ করে দেয় কে কেমন টাকা রোজগার করতে পারবেন। সবারই প্রত্যাশা থাকে কাজের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার। তাই শক্তিই যেন তাদের মূল চালিকা শক্তি।
Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

বগুড়ায় মানুষ কেনাবেচার হাট, দর কষাকষিতে বিক্রি হয় শ্রম আর স্বপ্ন

Update Time : ০৬:৫১:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
​বগুড়ায় বিভিন্ন পথে প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে এক মর্মস্পর্শী হাটের সূচনা হয়। স্থানীয়দের কাছে কামলার হাট নামে পরিচিত হলেও এটি মূলত সংগ্রামীজীবন ও কঠোর পরিশ্রমের এক নীরব জনপদ। হাটে কোনো পণ্য নয় বরং গায়ের শক্তি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ বেচাকেনা হয়। একেবারে পণ্যের মতোই চলে দর কষাকষি।
​এই হাটগুলোতে প্রতিদিন বিক্রি হয় নিম্ন আয়ের মানুষের শ্রম, ঘাম, মর্যাদা আর স্বপ্ন। জীবন ও জীবিকার কঠিন তাগিদে আসা এই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় বেচাকেনা, যা চলে সকাল ৯ টা পর্যন্ত।
​বগুড়া শহরের কলোনি বাজার,নামাজগড় মোড়, তিনমাথা, মাটিডালি বিমান মোড়, বাদুরতলা রাস্তা, চেলোপাড়া মধুবন সিনেমা হলের সামনে, ,গোদারপাড়া বাজার এবং চেলোপাড়া ব্রিজের পাশে বসে এই অদ্ভুত হাট। শুধু শহরে নয়, শেরপুর, ধুনট, সারিয়াকান্দি এবং মহাস্থানেও এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
​এগুলো হাটে দুই শ্রেণির মানুষের সমাগম ঘটে: একদল আসে শ্রম বিক্রি করতে, আরেকদল আসে সেই শ্রম কিনতে। ধানের চারা রোপণ, নিড়ানি,ধান কাটা-মাড়াই, রাজমিস্ত্রি, মাটিখনন, ড্রেনেজ পরিষ্কার থেকে শুরু করে ভারী কাজের জন্য দিন চুক্তিতে শ্রমিক নেওয়া হয়। শরীরের শক্তি থাকলে তাদের চাহিদা বাড়ে; অন্যথায় অনেকেই হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
​বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই এসব হাটে মানুষের ঢল নামে। ঘুম ঘুম চোখে, গ্রামের মাটির গন্ধ মেখে পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে হাজির হয় দিনমজুরের ঝাঁক। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট তাদের চোখে-মুখে। প্রতিটি মুখ যেন একেকটি ব্যর্থ জীবনের গল্প বলে যায় নিঃশব্দে। গৃহস্থরা কাজ সম্পন্ন করার চুক্তিতে কিংবা দিন কর্মঘণ্টা হিসেবে এই শ্রমিকদের কাজে নেন।এসব কাজে অংশ নেন খেটে খাওয়া পুরুষের সাথে অসহায় নারীরা।
​শহরের বাসিন্দারা জানান, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই নিম্ন আয়ের মানুষজন হাতে কোদাল ও ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। ক্রেতারা দরদাম করে দেখেশুনে শ্রমিক নিয়ে যান, তবে শত শত মানুষ উপস্থিত হলেও, সবার ভাগ্যে প্রতিদিন কাজ জোটে না। কাজ না পেলে অনাহারে কাটে তাদের দিন।
এদিক ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ এই কামলার হাটে আসেন। হাতে ব্যাগ আর বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। একেবারে পণ্যের মতো দর কষাকষিতে বিক্রি হন শ্রমজীবী মানুষ। এক স্থানে একত্রে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, যেকারণে ক্রেতার উপস্থিতিও বাড়ে। তারা দরদাম করে দেখেশুনে শ্রমিক নিয়ে যান। তবে পুরুষের তুলনায় নারীদের মজুরি কিছুটা কম।
কলোনি বাজারে বয়স্ক লোক এসেছে এনামুল শ্রম বিক্রি করতে। বয়স বাড়ছে, শরীরের শক্তিও কমছে। পেটের দায়ে দীর্ঘ ১২ বছর এখানে আসপন। আগের মতো ভারী কাজ করতে অসুবিধা হয়। আবাদি জমির পরিচর্যার কাজ করেন। কাজ যদি না পায় সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়।
মামুন নামের একজন বলেন, তিনমাথা হাটে এলে গায়ে বল থাকতে হয়। বল না থাকলে কেউ কিনে না। আর বিক্রি না হলে তখন সংসার চলে না। ধারদেনা করে চলতে হয়। ভাগ্য যেদিন সহায় হয়, সেদিন কাজ পাওয়া যায়। সব ধরনের কাজ করি। অনেক গৃহস্থ ৮ ঘণ্টার জায়গায় ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করে নেয়। কেউ কেউ ভালো আচরণ করলেও অনেকে খারাপ আচরণ করে।
শিবগঞ্জ থেকে হাটে এসে রহমান বলেন, জীবন আর জীবিকার জন্য এখন এই হাটেই নিজের শরীর বিক্রি করি। কাজ করে দিনের মজুরি কখনো ৬শ টাকা, কখনো ৮শ টাকা পাই।
নন্দীগ্রামের হোসেন বলেন, ধান কাটার মৌসুম এসেছে, এখন নিজের এলাকায় দাম বাড়বে। তখন কামলার হাটে শ্রমিকদের উপস্থিতিও কমবে। সমাজে অন্যান্য কাজ করা মানুষগুলো যতটুকু সম্মান পায়, আমরা সেই সম্মান পাই না। নিজে চলতে হয়, সাংসারিক খরচ মেটাতে হয়। আমার দিকে তাকিয়ে থাকে পুরো পরিবার।
শ্রম বিক্রি করতে আসা কয়েকজন নারী জানান, চেলোপাড়া হাটে প্রতিদিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক কর্মস্থলে কাজ শুরুর সময় থাকলেও শেষের নির্দিষ্ট সময় থাকে না। অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কোনো রকমে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে টিকে আছি।
যারা শ্রম কিনে নেন তাদের একজন রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান,শহরে কাজের লোকজনের অভাব রয়েছে। তবে দূর থেকে এসে এমন হাটে কাজ করতে আসেন। আমার মতো অনেকেই এসব শ্রমিক দিয়ে কাজ করায়, এতে আমাদের অনেক উপকার হয়।
শক্তি আর শ্রম নির্ধারণ করে দেয় কে কেমন টাকা রোজগার করতে পারবেন। সবারই প্রত্যাশা থাকে কাজের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার। তাই শক্তিই যেন তাদের মূল চালিকা শক্তি।