প্রথম আলোর সাবেকরা ব্যর্থ কেন?
- Update Time : ০৭:৫২:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
- / ৫৩৮ Time View

অবিশ্বাস্য অফার পেয়ে প্রথম আলো থেকে সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক গিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের কালের কণ্ঠ। তবে মেগা বাজেটের সেই পত্রিকা প্রথম আলোর সমান উচ্চতায় কখনও উঠতে পারেনি। বর্তমানে প্রথম আলোরই সাবেক একজন পত্রিকাটির হাল ধরেছেন। তবে আগের চেয়ে কোয়ালিটিতে ধ্বস নেমেছে।
টাইম ট্রাভেলের স্বপ্ন নিয়ে ঐতিহ্যবাহী দৈনিক বাংলার পুনঃপ্রকাশ ঘটেছে প্রথম আলোর এক সাবেকের হাত ধরে। বিশাল হাইপ তৈরি হয়েছিল পত্রিকাটি নিয়ে। তবে বছর দেড়েকের মাথায় ‘এত আনন্দ আয়োজন সবই যেন বৃথা’ হতে থাকে। প্রথম আলোর সাবেকও দায়িত্ব ছেড়ে দেন। অনেকটা মুখ থুবড়ে হাঁটার মতো অবস্থা এখন।
কালের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে স্টার সাংবাদিকদের জড়ো করে ‘ঢাকা প্রকাশ’ বের করেছিলেন প্রথম আলোর সাবেক আরেকজন। কিন্তু মাথা ভারী হওয়ায় কয়েক মাসেই অনলাইনটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরে তিনি বিপুল সমারোহে ‘খবরের কাগজ’ বের করেন। তবে সামসাময়িক বের হওয়া দু-একটি পত্রিকা আলোচনায় এলেও ‘খবরের কাগজ’ কাব্য-শিল্পমুখী মডেলে নিরামিষ নিরীহ গোছের হয়ে এখনও টিকে আছে। কোনো হাইপ তুলতে পারেনি।
প্রথম আলোর আরেক সাবেক, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পাওয়া সাংবাদিক কালের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে দৈনিক জাগরণে ৭ মাসের অভিযান শেষ করে সমকালের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। যিনি মন-মননে একজন কবি। সেই কাব্যময় প্রতিভার আলোয় সমকালকে বছর দশেক আলোকিত করে রংধুন গ্রুপের মেগা বাজেটের প্রতিদিনের বাংলাদেশের দায়িত্ব নেন। ঢাউস টিমও গড়ে তোলেন। তবে পত্রিকাটির আভিজাত্য আর নেই। প্রথম আলোর সাবেকও ছেড়ে দিয়েছেন দায়িত্ব।
প্রথম আলোর বার্তা ও উপসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আরেক সাবেক ২০২১ সালে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হয়েছিলেন। তবে বেশিদিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। নীরবেই তিনি সমকাল ছেড়ে যান। বর্তমানে একটি পত্রিকা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে সম্প্রতি বিদেশি অর্থায়নে ‘চরচা’ নামের অনলাইন মিডিয়ায় যুক্ত হয়েছেন কবি সোহরাব হাসান। তার সফলতা বা ব্যর্থতার আলোচনা এখন সময়সাপেক্ষ।
কয়েক মাস আগে চাকরি ছেড়ে বিগ বাজেটের মিডিয়া আউটলেট ‘ঢাকা ও বাংলা স্ট্রিম’ গড়ে তুলেছেন প্রথম আলোর সাবেক জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক অসাধারণ এক প্রতিবেদক। তার সহযোগী ছিলেন প্রথম আলোর সাবেক সাহিত্য সম্পাদক। তবে গেল জুলাই মাসে সেই সাবেকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও বদ আচরণের অভিযোগ তোলেন প্রায় এক ডজন নারীসহ ২০-২২ জন সহকর্মী। প্রতিকার না পেয়ে এক নারী সহকর্মী আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন। সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে নেতিবাচক আলোচনায় এসেছে প্রথম আলোর সাবেকদের হাত ধরে গড়ে ওঠা, এতদিন আড়ালে থাকা সেই মিডিয়া আউটলেটটি।
প্রথম আলোর সাবেক এক রিপোর্টারের তত্ত্বাবধানে মফস্বলকে প্রাধান্য দিয়ে বিশাল বাজেটের ‘আজকের পত্রিকা’ ২০২১ সালে বাজারে আসে। প্রথম আলোর আরও কিছু সাবেক পত্রিকার অনলাইনে ভিন্নমাত্রা ও স্টাইল আনতে চেষ্টা করেন। যেখানে প্রথম আলোর চিন্তাকাঠামো খানিকটা দৃশ্যমাণ হয়। অবশ্য, মেঘের যতটা গর্জন দেখা গিয়েছিল, শেষ অবধি ততটা বর্ষেনি। সেই সাবেকও চলে গেছেন পত্রিকা ছেড়ে।
তবে এত আশাভঙ্গের মধ্যেও প্রথম আলোর চিন্তাকাঠামোর ছক ভেঙে ভিন্নমাত্রায় ২০১২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বিজনেস ডেইলি হিসেবে বণিক বার্তা প্রকাশ করেন প্রথম আলোর সাবেক এক সিনিয়র বিজনেস রিপোর্টার। যা ব্যবসা সফল হওয়ার পাশাপাশি দারুণ জনপ্রিয়তাও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এখন অবধি।
নানামুখী ইস্যুতে সব সময়ই সাংবাদিকদের আলোচনার টেবিলে স্থান পায় বাংলা ভাষায় বিশ্বের এক নম্বর ওয়েবসাইট, দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা গণমাধ্যম প্রথম আলো। বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই প্রথম আলোর সাংবাদিকদের হায়ার করেন প্রথম আলোর বিকল্প তৈরির জন্য। বিরাণ মস্তিষ্কের অনেক প্রকাশক ও সম্পাদকও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে প্রথম আলোর কপি করতে চান। তবে বরাবরই ফলাফল জিরো আসে। অনেক সময় বাজেট ফেল করে প্রকল্পটি শাটডাউনও হয়ে যায়।
প্রথম আলোর সাবেকরা কেন ব্যর্থ হন বার বার- ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বহুদিন ধরেই ব্যক্তিগত ও টেবিল আলোচনায় অনেক বিশ্লেষণ করেছি। উপসংহারেও এসেছি। তবে আজ হঠাৎ করেই প্রথম আলোর এক সাবেক, ‘স্বঘোষিত’ বুদ্ধিজীবী ব্রাত্য রাইসুর পোস্ট পড়ে সেসব ডালপালা মেলল। তিনি প্রথম আলোর সম্পাদকের যৌক্তিক ও আবেগী প্রশংসা করে শেষে লিখেছেন, “আমরা প্রথম আলো রান্নাঘরটির একটি মাইক্রোওভেন, একটি গ্যাসের চুলা, একটি ডেগ বা একটি খুন্তি হইতে পারব—শেফ বা মতি ভাই হওয়া আমাদের হইয়া উঠবে না। বরং প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা হওয়া সহজ। প্রথম আলো চিন্তাকাঠামোর বাইরে গিয়া মতি ভাই হইয়া উঠতে হবে আপনাদের।”
বোঝা যাচ্ছে, প্রথম আলোর চিন্তাকাঠামোয় চিন্তা চর্চাকারীরা ‘মতি ভাই’ ব্যতীত বিকল্প প্রথম আলো তৈরিতে কখনই সক্ষম হবেন না। অর্থাৎ সাবেকদের চিন্তাকাঠামো থেকে প্রথম আলোর অস্তিত্ব ডিলিট করতে পারলেই কেবল স্বকীয় কাঠামোয় সফল মিডিয়া বিনির্মাণ সম্ভব হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, চিন্তায়, সৃজনশীলতায় ব্রাত্য রাইসুর ‘মহামানব’ মতি ভাইয়ের ইকোসিস্টেমে অভ্যস্ত হয়ে কীভাবে একজন তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হতে পারে? বৃত্তের ভেতরে সেই বৃত্তের চেয়ে বড় কোনো বৃত্ত আঁকা কি সম্ভব?
















