১১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

থমকে যাওয়া বিকেল

নিয়ন মতিয়ুল
  • Update Time : ১০:০৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১১৪ Time View

“আইন যেখানে নীরব, শব্দ সেখানে চিৎকার করে!” শুধু থার্টি ফার্স্টের শব্দদূষণই নয়, ঢাকাকে প্রতিমুহূর্তে অসভ্য শহর মনে হয়। অলিতে-গলিতে, ফুটপাতে, পাবলিক বাসে অসংখ্য অসভ্য চরে বেড়ায়। পাড়ায়-মহল্লায় মাস্তানি করে চাঁদা তোলে, সড়কে ছিনতাই করে অসভ্যেরা। সরকারি, বেসরকারি অফিসে বহু অসভ্য, বর্বর দাঁতমুখ খিচিয়ে গর্জন করে।

নিরীহ জনগণকে আটকে দিয়ে সড়ক অবরোধ করে বসে থাকে অসভ্যেরা। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে কথিত জনসেবকরা অসভ্যের মতো জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায়। কিছু হলেই অসভ্যেরা তেড়ে এসে যানবাহন ভাঙচুর শুরু করে। সরকারের হতাকর্তারাও অসভ্যের মতো কানে তুলো দিয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক অসভ্যের মতো রাজনৈতিক দালালি করে। আবার বহু শিক্ষার্থী সেসব দালালদের অসভ্যের মতো দৌড়ানি দেয়, বর্বরতম গুরুদক্ষিণা দেয়। নারী-পুরুষের গোপনাঙ্গের নাম ব্যবহার করে বহু মেধাবী অসভ্য অশ্রাব্য স্লোগান দেয়। নাগরিক অধিকারের নামে অসভ্য আচরণ করা হয়।

আর এসবই হয় রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহারের অসভ্য আচরণ থেকে। বড় বড় দলের দেশব্যাপী নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশে আছে লাখ লাখ অসভ্য। দল বা আদর্শ নয়, এরা ভালোবাসে ক্ষমতাকে, যা তাদের অসভ্য, বর্বর, খুনি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটকারী বানায়। ক্ষমতার এমন অসভ্য চর্চাতেই এরা নিশ্চিহ্ন করে দেয় নাগরিক সম্মানবোধ।

ক্ষমতার অসভ্য চর্চা থেকেই নাগরিক অসভ্যতা ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে। কি পরিবার, কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সবখানেই পাশবিক উল্লাসে মেতে উঠে নাগরিক অসভ্যরা। ব্যক্তিগত আনন্দই এসব অসভ্যের কাছে বড়, তাদের আনন্দের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অন্যরা বাঁচল না মরল তাতে কিছু যায় আসে না।

আদিম প্রাণীসমাজে গর্জন, দলবদ্ধ হয়ে চিৎকার ছিল টিকে থাকার অস্ত্র, আধিপত্য বিস্তারের কৌশল। মধ্যযুগে ঢোল, শঙ্খ, যুদ্ধের দামামা ছিল এলাকা জয়ের শব্দ। আধুনিক রাষ্ট্রে যখন নাগরিকদের নিষ্ঠুরভাবে দমানো হয়, তখন তারা শব্দ তৈরি করে। অসভ্য, নিপীড়ক রাষ্ট্রে নাগরিকরা বিকট শব্দ তৈরি করে, অশ্লীল স্লোগান দেয়, ভয়াবহ দূষণেও নীরব থাকে।

ঢাকা সত্যিই অসভ্য শহর। পল্লী-প্রান্তিক থেকে প্রতিদিন কাজ আর টাকার নেশায় ছুটে আসছে লাখ লাখ মানুষ, অসভ্য নগরীতে। মিশে যাচ্ছে অসভ্যতার ভিড়ে। যেখানে রঙিন স্বপ্নগুলো প্রতিদিন ধূসর হয়। ভয়, আতঙ্ক, রোগ, শোক, অসততা, ঘৃণা, প্রতিহিংসা, প্রতারণা, জিঘাংসা, হতাশা, বহুমুখী দূষণে মানুষ মানসিক রোগীতে পরিণত হয়। ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় জীবনে সোনালি স্বপ্নগুলো।

অসভ্য, মৃতুপুরীতে নববর্ষ আসে রাতভর পাশবিক উল্লাস নিয়ে। অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন কুয়াশা ভেদ করা সূর্যের ম্লান আলো কিছুটা প্রাণশক্তি দেয়। বিকেলের ঢলে পড়া সূর্যটা বলে যায়, বিষাদের নগরীতে আমরা কতটা তুচ্ছ। মহাকালের মহাসমুদ্রে বিন্দুসম জীবনের কি উন্মত্ততা! মহাজগতকে জানা, জীবনের মানে বোঝার আগেই ঝরে যেতে হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

থমকে যাওয়া বিকেল

Update Time : ১০:০৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

“আইন যেখানে নীরব, শব্দ সেখানে চিৎকার করে!” শুধু থার্টি ফার্স্টের শব্দদূষণই নয়, ঢাকাকে প্রতিমুহূর্তে অসভ্য শহর মনে হয়। অলিতে-গলিতে, ফুটপাতে, পাবলিক বাসে অসংখ্য অসভ্য চরে বেড়ায়। পাড়ায়-মহল্লায় মাস্তানি করে চাঁদা তোলে, সড়কে ছিনতাই করে অসভ্যেরা। সরকারি, বেসরকারি অফিসে বহু অসভ্য, বর্বর দাঁতমুখ খিচিয়ে গর্জন করে।

নিরীহ জনগণকে আটকে দিয়ে সড়ক অবরোধ করে বসে থাকে অসভ্যেরা। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে কথিত জনসেবকরা অসভ্যের মতো জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায়। কিছু হলেই অসভ্যেরা তেড়ে এসে যানবাহন ভাঙচুর শুরু করে। সরকারের হতাকর্তারাও অসভ্যের মতো কানে তুলো দিয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক অসভ্যের মতো রাজনৈতিক দালালি করে। আবার বহু শিক্ষার্থী সেসব দালালদের অসভ্যের মতো দৌড়ানি দেয়, বর্বরতম গুরুদক্ষিণা দেয়। নারী-পুরুষের গোপনাঙ্গের নাম ব্যবহার করে বহু মেধাবী অসভ্য অশ্রাব্য স্লোগান দেয়। নাগরিক অধিকারের নামে অসভ্য আচরণ করা হয়।

আর এসবই হয় রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহারের অসভ্য আচরণ থেকে। বড় বড় দলের দেশব্যাপী নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশে আছে লাখ লাখ অসভ্য। দল বা আদর্শ নয়, এরা ভালোবাসে ক্ষমতাকে, যা তাদের অসভ্য, বর্বর, খুনি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটকারী বানায়। ক্ষমতার এমন অসভ্য চর্চাতেই এরা নিশ্চিহ্ন করে দেয় নাগরিক সম্মানবোধ।

ক্ষমতার অসভ্য চর্চা থেকেই নাগরিক অসভ্যতা ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে। কি পরিবার, কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সবখানেই পাশবিক উল্লাসে মেতে উঠে নাগরিক অসভ্যরা। ব্যক্তিগত আনন্দই এসব অসভ্যের কাছে বড়, তাদের আনন্দের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অন্যরা বাঁচল না মরল তাতে কিছু যায় আসে না।

আদিম প্রাণীসমাজে গর্জন, দলবদ্ধ হয়ে চিৎকার ছিল টিকে থাকার অস্ত্র, আধিপত্য বিস্তারের কৌশল। মধ্যযুগে ঢোল, শঙ্খ, যুদ্ধের দামামা ছিল এলাকা জয়ের শব্দ। আধুনিক রাষ্ট্রে যখন নাগরিকদের নিষ্ঠুরভাবে দমানো হয়, তখন তারা শব্দ তৈরি করে। অসভ্য, নিপীড়ক রাষ্ট্রে নাগরিকরা বিকট শব্দ তৈরি করে, অশ্লীল স্লোগান দেয়, ভয়াবহ দূষণেও নীরব থাকে।

ঢাকা সত্যিই অসভ্য শহর। পল্লী-প্রান্তিক থেকে প্রতিদিন কাজ আর টাকার নেশায় ছুটে আসছে লাখ লাখ মানুষ, অসভ্য নগরীতে। মিশে যাচ্ছে অসভ্যতার ভিড়ে। যেখানে রঙিন স্বপ্নগুলো প্রতিদিন ধূসর হয়। ভয়, আতঙ্ক, রোগ, শোক, অসততা, ঘৃণা, প্রতিহিংসা, প্রতারণা, জিঘাংসা, হতাশা, বহুমুখী দূষণে মানুষ মানসিক রোগীতে পরিণত হয়। ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় জীবনে সোনালি স্বপ্নগুলো।

অসভ্য, মৃতুপুরীতে নববর্ষ আসে রাতভর পাশবিক উল্লাস নিয়ে। অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন কুয়াশা ভেদ করা সূর্যের ম্লান আলো কিছুটা প্রাণশক্তি দেয়। বিকেলের ঢলে পড়া সূর্যটা বলে যায়, বিষাদের নগরীতে আমরা কতটা তুচ্ছ। মহাকালের মহাসমুদ্রে বিন্দুসম জীবনের কি উন্মত্ততা! মহাজগতকে জানা, জীবনের মানে বোঝার আগেই ঝরে যেতে হয়।